Sunday, June 17, 2018

পিন্ডির প্রলাপ ॥ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কমেন্ট্রি -তোয়াব খান কমেন্ট্রি ॥ গোয়েবলসের প্রেতাত্মা

পিন্ডির প্রলাপ ॥ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কমেন্ট্রি -তোয়াব খান 
কমেন্ট্রি ॥ গোয়েবলসের প্রেতাত্মাImage may contain: 1 person

জঙ্গী শাসক ইয়াহিয়া খান আর তার জল্লাদ বাহিনীর তোতা পাখিগুলো সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একই শেখানো বুলি আউড়ে চলেছে রেডিও গায়েবী আওয়াজে। গ্রামোফোন কোম্পানির কুকুরের ছবিওয়ালা সেই রেকর্ডের মতো। পিন দিয়ে চড়িয়ে দিলেই হলো কলের গান বাজতে শুরু করবে। বাঁধাগতে গান হবে। সকাল-সন্ধ্যা-রাত, যখনই খুলুন না কেন, পড়ানো লব্জই তোতার একমাত্র পুঁজি। সকাল বেলা উঠলেই শুনতে পাবেন, ‘অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’। দুপুরে- ‘দেশপ্রেমিক জনসাধারণ দুষ্কৃতকারীদের প্রশ্রয় দেন নাই, বরং সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন’। এরপর রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পিন পাল্টে দেয়া হবে। আর তোতার কণ্ঠে শোনা যাবে- ‘একদল অনুপ্রবেশকারী আমাদের সীমান্তের কয়েক শ’ গজ ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। আমাদের সেনাবাহিনী শুরুতেই তাদের বাধা না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। পরে সময়মতো আক্রমণ চালায়। আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে অনুপ্রবেশকারীরা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়’। এরপরই অস্ত্রপাতির একটি লম্বা ফর্দ পেশ করা হয়। হতাহতের সংখ্যা নেই বলে উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে বলা হয় ‘কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে’। দিনের পর দিন তোতার কণ্ঠে ‘রেডিও গায়েবী’ আওয়াজের এ বাণীই শুনতে পাওয়া যাবে। অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাও আবার বাড়তে-বাড়তে হয়ে যায় কয়েক হাজার। কিন্তু তোতার প্রভুর কয়জন বরকন্দাজ মারা গেল সে সম্পর্কে গায়েবী আওয়াজ একেবারেই চুপ। সমরবিদ্যার সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটিরও পেটের পিলে এ জাতীয় কথাবার্তা শুনে ফেটে যেতে পারে হাসতে-হাসতে। সীমান্তের কয়েক শ’ গজ ভেতরে। হতাহতের সংখ্যা কথা উল্লেখ নেই। কয়েকজন গ্রেফতার-অর্থাৎ সঠিক সুস্পষ্ট কোন তথ্য তোতার মুখে ভুল করেও শোনা যাবে না। যদি প্রশ্ন করা হয়, মাথা খারাপ হয়েছে ও কথা মুখে আনবেন না। কোন তথ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা সাফ মানা। তার ওপর তোতা কি প্রশ্ন করতে পারে? কিন্তু মুশকিল হয়েছে গ্রামোফোন কোম্পানির তোতা আর তার প্রভু ছাড়াও বাইরের যে জগতটি রয়েছে তাকে নিয়ে। তাঁরা তো তোতা নয়, তাই প্রশ্ন তারা তুলছে। বলছে, হাতে কোন সুস্পষ্ট তথ্য থাকলে ছাড়ুন না।

কয়েক হাজার অনুপ্রবেশকারী কয়েক শ’ গজ ভেতরে, কয়েকজন গ্রেফতার হতাহত নেইÑ এসব কথা শুনলে তো পাগলেও হাসবে। বাংলাদেশে কি ঘটেছে বা এখন কি ঘটছে সে সম্পর্কে তোতার মুখের কাহিনী ছাড়া অন্য কিছু যাতে দুনিয়ায় প্রচারিত না হয় তার জন্য ইয়াহিয়া খান ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা প্রথমেই সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছেন। পরে দুনিয়াব্যাপী প্রতিবাদের মুখে নিজেদের পছন্দ মতো বাছাই সাংবাদিকদের বাংলাদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। সে সঙ্গে বলে দেয়া হলোÑ অমুক অমুক জায়গায় যেতে পারবেন না। তমুক তমুক কথা লিখতে পারবেন না। অমান্য করলে হয় আটক, নয় লেখা গুম। এতসব বাধা-নিষেধ সত্ত্বেও বিদেশী খবরের কাগজগুলো যা লিখছে তাতে জঙ্গী শাহীর প্রচারের বা অপপ্রচারের বেলুনটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।Image may contain: 1 person, sunglasses and closeup

নিউজ উইক পত্রিকার কথায় ধরা যাক, এ সাপ্তাহিকটির সঙ্গে সাক্ষাতকারে ইয়াহিয়া খান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য বলেছিলেন। সে কাগজই লিখেছে, ইয়াহিয়ার সরকার যাদেরকে অনুপ্রবেশকারী ভারতীয় চর বলছে তারা তো শুরু থেকে লড়ছে সামরিক চক্রের বিরুদ্ধে। এরা বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর লোকজন ছাড়া আর কিছুই নয়। পত্রিকাটিতে ভারতীয় গোলাবর্ষণের পাকিস্তানের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শেলগুলো পরীক্ষা করলেই যে কোন পর্যবেক্ষক বুঝতে পারবেনÑ এগুলো নিকট পাল্লার কামান বা দু’ইঞ্চি মর্টার থেকে বর্ষিত হয়েছে। দূরত্ব বিচার করে একথা অনায়াসে বলা চলে, ভারত থেকে বর্ষণ করলে শেলগুলো এত দূরে আসতে পারে না।

বিলেতের কাগজগুলো, বিবিসি, ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন সংবাদপত্র লামন্ড বলছে একই কথা। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? তোতার শেখানো লবজ তো পাল্টে যাবে না। এরপর ধরুন না, অবস্থা স্বাভাবিক, দেশপ্রেমিকরা দুষ্কৃতকারীদের ধরিয়ে দিচ্ছে তোতার এ বাণীর কথা। দেশপ্রেমিক নাগরিকরা জঙ্গীশাহীর সঙ্গে এমনই সহযোগিতা করছেন যে, এখন তাদের ওপর পিটুনি ট্যাক্স ধার্য করতে হচ্ছে জঙ্গীশাহীকে। এতেও যদি নিজেদের দৈন্য প্রকাশ না পায়, তবে দৈন্য শব্দের আভিধানিক অর্থই পাল্টে ফেলতে হবে। বিবিসির ভাষ্যকারের মতে, পিটুনি ট্যাক্স ধার্য থেকে বাংলাদেশের অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক-জঙ্গী শাহীর দাবির অসারতা দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পেরেছে।

শুধু তাই নয়, মুক্তিবাহিনীর লোকজন বাংলার মানুষের যে অকুণ্ঠ সহযোগিতা পাচ্ছেÑ এতে কী তা সুস্পষ্ট বোঝা যায়? দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টেলিগ্রাফ ও বিবিসির মতে, বাংলাদেশের মাইলের পর মাইল এলাকায় ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী বা তার ক্রীড়নক সরকারের কোন অস্তিত্ব নেই। সেখানে মুক্তিবাহিনীর কর্তৃত্ব সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সর্বোপরি ইয়াহিয়ার চামচার দল রাতের বেলায় কোথাও বের হতে সাহস করে না। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জঙ্গীশাহীর এই যখন হাল-হকিকত সৈন্য দলের মোর‌্যাল ঠিক রাখার জন্য ঠিক তখন খান সাহেবরা গোয়েবলসে প্রেতাত্মার ঘাড়ে ভর করেছেন। তাই প্রতিদিন কুৎসা আর মিথ্যার বোঝা তাদের বেড়েই চলেছে। কিন্তু সেই দিন আর দূর নয়। যখন মিথ্যের বোঝায় চাপা পড়ে জঙ্গীশাহীকে পুঁজিপাট্টাসমেত পৈত্রিক প্রাণটাও হারাতে হবে।
Image may contain: 1 person, on stage
গোমর ফাঁক
একেবারে গোমর ফাঁক। ইয়াহিয়া খানের জবর বাক্যবাগীশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজীকে একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে মার্কিন কাগজ নিউজ উইক। তিনি বলেছিলেন মার্চে যা করেছি, প্রয়োজনবোধে আবার তা করব ঢাকার রাজপথে। আমাদের ট্যাংকগুলো অপেক্ষা করছে। কিন্তু নিউজ উইকের সিনিয়র এডিটর আরনড দ্য ব্রচগ্রেভ তো আর নিয়াজীর ক্যান্টনমেন্টের সিপাই নন। সাফ বলে দিয়েছেন, জেনারেল তুমি মূর্খের স্বর্গে বাস করছ। পায়ের তলায় মাটি যে কতটা সরেগেছে তার তো খবর রাখ না। বাংলাদেশের শতকরা ২৫ ভাগ থানার ওপর তোমাদের কোন কর্তৃত্ব নেই। মুক্তিবাহিনীর কর্তৃত্ব সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত। খোদ ঢাকার উত্তরাংশ এখন মুক্ত।

বাংলাদেশে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শেষ করার লম্বা-চওড়া আশ্বাসদানকারী নরঘাতক জেনারেল টিক্কাখানের সুবৃহৎ বেলুনটি চুপষে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই এ.এ.কে নিয়াজীর আবির্ভাব। পাঞ্জাবের সাবেক সামরিক প্রশাসক ও এই জেনারেলের ভূমিকা সামরিক চক্রের জঘন্য ষড়যন্ত্রগুলোতে কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ সারাদেশ গর্জে উঠেছিল আইয়ুবের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। হরতাল, মিছিল আর ঘেরাওয়ে প্রকম্পিত হয়েছিল সামন্তপ্রভু একচেটিয়া পুঁজিপতি আর সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্রের প্রাসাদ।

পশ্চিমা আমলারা আহার-নিন্দ্রা পরিত্যাগ করে ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছিল সামরিক অফিসারদের বাড়িতে বাড়িতে। সে সময়ে এ নিয়াজীকে দেখা যায় ঝিলামের একটি সামরিক ছাউনী এলাকায় অফিসারদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে, সংগঠিত করতে। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চের ইয়াহিয়ার সামরিক অভ্যুত্থানের কাহিনী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফ বলেছিল, জেনারেল নিয়াজীর (যাঁকে সামরিক চক্র টাইগার নিয়াজী বলে অভিহিত করে থাকে)। নেতৃত্বে একদল অফিসার এ মর্মে আল্টিমেটাম দিয়েছিল যে, তারা বাংলাদেশের তথাকথিত অরাজকতা কোন মতেই বরদাস্ত করতে রাজি নয়। তাদের মতে, এই সময়ে যা চলছে তাকে বাড়তে দিলে সব যাবে।

পাঞ্জাবের ঝিলামের সেই কুখ্যাত বৈঠকে ঠিক করা হয়েছিল বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য। যদি দরকার হয় তবে লক্ষ লক্ষ লোককে সাবাড় করে দেয়া হবে।

শহরে, নগরে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলের ওপর প্রয়োজনবোধে চালানো হবে ট্যাঙ্ক। তবে নিয়াজীর বড় আফসোস ছিল ১৯৬৯ সালেই এগুলো ঘটেনি বলে। অতএব নিয়াজী এ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশের গণহত্যার ব্লু প্রিন্টটা দু’বছরের জন্য কোল্ড স্টোরেজে রেখে দিয়েছিল। তাই একাত্তর সালের মার্চের শুরুতেই বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলনের আলোতেই এসব জেনারেল তাদের বিপদের সংকেত দেখতে পায়। কায়েমি স্বার্থ বিপন্ন। তাই তারা চক্রান্তের জাল ফেলতে শুরু করল একে একে। অবশেষে এলো ২৫ মার্চের সেই কালো রাত।

টিক্কা খানের সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল নিয়াজী বাংলাদেশে এলেও চলমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তার আগমন বার্তা ঘোষিত হয়নি। কিছুটা নেপথ্যেই রয়ে গেলেন তিনি। দায়িত্ব দেয়া হলো বাঙালী নিধনের অপারেশনের। তারপর একদিন রণাঙ্গণে তার আবির্ভাব সামরিক প্রশাসক ও ইস্টার্ন কমা-ের কমান্ডাররূপে। কিন্তু এবারে জেনারেল সাহেবের ইস্টার্ন কমান্ড একেবারেই ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে মুক্তিবাহিনীর গোলা আর বুলেটের আঘাতে আঘাতে। অবস্থা বেগতিক দেখে একদল ক্ষুদে ডাকাত রাজাকার শাসক সৃষ্টি করা হলো যাদেরকে নিউজ উইক পত্রিকা ‘রাস্তার বখাটে তস্কর দল’ বলে অভিহিত করেছে। পত্রিকাটির মতে, অস্ত্র হাতে আছে বলে রাজাকারের দল নিজেদের খোদা বলে মনে করে।

যত্রতত্র নিরীহ নিরস্ত্র জনসাধারণের কাছ থেকে টাকা-পয়সা আদায় করছে। যারা তাদের আশ্রয় দিতে বা মেয়েলোক সরবরাহ করতে অস্বীকার করছে, তাদেরকে হত্যা করছে গুলি করে। এরপর মুক্তিবাহিনীর দুর্বার অভিযানের সামনে সেনাবাহিনী প্রথমেই ঠেলে দিচ্ছে এসব নির্বোধ রাজাকারের দলকে। এসব সত্ত্বেও জেনারেল নিয়াজীর লম্বা-চওড়া দাবি কেন? নিউজ উইকের মতে, পরাজয়ের গ্লানি কিছুটা লাঘবের জন্য জেনারেলের জল্লাদ বাহিনী নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে ব্যাপক হারে, চালাচ্ছে লুটতরাজ।
সংবাদদাতা ঢাকা ডেমরা এলাকার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ইয়াহিয়ার সৈন্যদল এ গ্রামটিও ঘেরাও করে বার থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের প্রত্যেক মহিলার ওপর পাশবিক অত্যাচার চালায় এবং বার বছরের ওপরে সকল পুরুষকে হত্যা করে। এ হত্যা, লুণ্ঠন ও পাশবিকতায়ও শেষ রক্ষা যে অসম্ভব দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ আর পদ্মা, মেঘনা, যমুনার উত্তাল তরঙ্গের দিকে তাকালেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।


বুমেরাং
ব্যাপারটি এমন বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনীর জবরদস্ত সেনাপতি ইয়াহিয়া খান সাহেবের তা কি ভাবতে পেরেছিলেন? দুধ-কলা দিয়ে পুষে যাকে চীনে পাঠানো হলো সেই কি না বলে ফোঁস? চীন কি আশ্বাস দিয়েছে না দিয়েছে সেটা বড় কথা নয়। চীন থেকে এসেই ভুট্টো চীনা হাজী বলে জাহির করতে আরম্ভ করে দিয়েছে নিজেকে। ভুট্টোর বাগাড়ম্বরে মদদ দিচ্ছে কয়েকজন ডাকসাইটে আমলা আর খোদ ইয়াহিয়ার জঙ্গী চক্রের ইনার সার্কেলের জনা দুই জেনারেল।
আমলাদের মধ্যে আছেন পাকিস্তানের সাবেক ফরেন সেক্রেটারি এস.এম. ইউসুফ। তিনি পাকিস্তান স্টীল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। অপরজন হলেন ইয়াহিয়ার অর্থ উপদেষ্টা এম.এম আহমদ। এ দু’জন নাকি চীনে প্রেরিত প্রতিনিধি দলের নেতারা ভুট্টোকে দেয়া আশ্বাসের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ দিয়েছিলেন। একেবারে শালুক চিনেছে গোপাল ঠাকুর। আইয়ুবের আলো দশকে পর্বত প্রমাণ অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টিতে কোন একটি আমলার ব্যক্তিগত অবদান যদি সর্বাধিক হয়ে থাকে তবে তার নাম নিঃসন্দেহে এম.এম আহমদ।

এই দশ বছরে অর্থ দফতরের চাবিকাঠি কোন সময়ে ভদ্রলোকের হাতছাড়া হয়নি। তিনিও হতে দেননি। অর্থই অনর্থের মূল। তাই তিনি এটাকে নিয়েই নাড়াচাড়া করেছেন। ছিলেন কখনও অর্থ সেক্রেটারি, কোন সময়ে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান বা খোদ প্রেসিডেন্টের অর্থ উপদেষ্টা। তারই অধিনায়কত্বে পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তান) মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যারোমিটার একলাফে শুধু মাথায় উঠেনি, পাকিস্তানের কুখ্যাত বাইশ পরিবার দেশের ব্যাংক বীমা ও কারখানার শতকরা আশি ভাগ সম্পদ করায়ত্ত করতে সমর্থ হয়েছে। পাঞ্জাবের কায়েমী স্বার্থবাদী অর্থাৎ সামন্ত ভূস্বামীর গায়ে আঁচড়টিও লাগুক, এমন কিছু ভদ্রলোক হতে দেননি কোন সময়ে।

অন্যদিকে, এককালের ফরেন সেক্রেটারি এস.এম. ইউসুফ বর্তমানে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করে আছেন যাকে লুটপাট ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না। এ প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান স্টীল কর্পোরেশনের কাজ কারবার এমন এলাহী ব্যাপার যে, তার তুলনা মেলা সত্যিই অসম্ভব। করাচিতে একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপনের ভার দেয়া হয়েছিল এ প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রায় চৌদ্দ বছর আগে। এ কারখানা স্থাপনের সর্বমোট আনুমানিক যে খরচ ধরা হয়েছিল পাকিস্তানের কর্মকর্তারা চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা রিপোর্ট তৈরির আগেই তার চেয়ে বেশ কয়েক কোটি টাকা বেশি সাবাড় করে ফেলেন।

এরমধ্যে বিদেশ থেকে পাওয়া ঋণ হিসেবে পনের কোটি টাকার বৈদেশিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। আর জনগণের এ পয়সা লুটপাটের প্রধান বখরা জুটেছে বাইশ পরিবারের লোকজনদের ভাগ্যে। এ দু’জন খ্যাতিমান আমলার সঙ্গে আরও একজন জেনারেল এসে দাঁড়িয়েছেন ভুট্টোর পেছনে। পাকিস্তান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রধান মেজর জেনারেল আকবর খান। ইসলামের গ্লোরি একটু নড়চড় হলেই জেনারেল সাহেব একেবারে অগ্নিশর্মা। এ জন্য তিনি মওদুদীর ইসলামী জামায়াতকে আকাশে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে মওদুদীর ইসলাম তার আর জামায়াত পশ্চিম পাকিস্তানে একেবারে ধরাশায়ী হওয়াতে তিনি প্রমাদ গুনলেন। ইসলামের গ্লোরি যায় যায়। কি উপায়? উপায় মিলেও গেল। ভুট্টোর টম টম মজুদই ছিল। উঠে বসলেন। শুরু হলো ইসলামাবাদের সামরিক গোয়েন্দা দফতরের সুরম্য প্রাসাদটিতে একের পর এক চক্রান্ত।

কিন্তু এতসব সত্ত্বেও ভুট্টোর ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ গোছের ভাবসাব পছন্দ করতে পারছেন না পশ্চিম পাকিস্তানের আরও দু’জন জেনারেল গবর্নর। সিন্ধুর গবর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল রহমান গুল ও পাঞ্জাবের গবর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান। তারা নাকি ইয়াহিয়া খানকে বলেছেন, ভুট্টোর বুজরুকিতে বিশ্বাস করার কিছুই নেই, পিকিং তাকে খালি হাতে শুধু মিষ্টি কথায় ফেরত পাঠিয়েছে। সব মিলিয়ে পি-িতে এখন জেনারেলে জেনারেলে টক্কর লাগার মত অবস্থা। তাই ইয়াহিয়ার নাকি আহার-বিহার শিকেয় উঠেছে।

অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে এক প্রখ্যাত সাংবাদিক ও পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার সাবেক সম্পাদক মাজহার আলী খান সম্প্রতি বলেছেন, ১৯৬৫ সালের আগে পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানকে যত সৈন্য বা অফিসার হারাতে হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি মারা পড়েছে মুক্তি বাহিনীর হাতে। পিআইয়ের বিমানগুলো প্রতিনিয়ত ঢাকা থেকে বয়ে এনেছে আহত অফিসার ও জোয়ানদের। জনাব খান কুয়েতের ডেইলি নিউজ পত্রিকায় লিখিত নিবন্ধে একথা জানিয়েছেন। তার মতে, সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব শুধু বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ। এর ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে অরাজকতা। মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তিনি প্রশ্ন করেছেন, এভাবে আর কতদিন চলতে পারে। যখন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে, সেনাবাহিনীর চাহিদা বাড়ছে দিনের পর দিন এবং বৈদেশিক সাহায্যের উৎসগুলো শুকিয়ে আসছে। জনাব খান বলেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানের বহু লোক এখন প্রকাশ্যে বলছেন, ১৯৫৮ সালে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলকে যদি খারাপরূপে আখ্যায়িত করা হয়, তবে দু’জন জেনারেলের তেরো বছরের শাসনে দেশ এখন বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানীরা এখন ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশকে (পূর্ব পাকিস্তান) জোর করে আর আটকে রাখা সম্ভব কী না। পশ্চিম পাকিস্তানের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যদি ইতিহাসের পাতা একবার উল্টে দেখেন, বাংলার মানুষের রক্তের অক্ষরে লেখা স্বাধীনতার দীপ্ত শপথের নতুন অধ্যায় সেখানে দেখতে পাবেন।
ইয়াহিয়ার ভিক্ষার থলে
ইয়াহিয়ার জঙ্গী সামরিক চক্র বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মোকাবিলায় নাজেহাল হয়ে পূর্বে আর পশ্চিমে ছোটাছুটি করছে ভিক্ষের থলে নিয়ে। ভিক্ষের এ থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য দু’ধরনের দালালও মজুদ রয়েছে। একদল ছুটছে পশ্চিমে নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটন অভিমুখে, অন্যদল পা বাড়িয়েছে পিকিংয়ের পথে। ওয়াশিংটনে দেন-দরবার করছে দক্ষিণপন্থী পিডিবি, জামায়াতে ইসলাম আর মুসলিম লীগের নেতারা। আর পিকিং গেছে বামপন্থীর ভেকধারী ক্ষমতালোলুপ জুলফিকার আলী ভুট্টো।
উদ্দেশ্য অবশ্য একটাই-বাংলায় গণহত্যার জন্য দু’হাতে রসদ, মাল-মসলা সংগ্রহ করা। পাকিস্তানের কূটনৈতিক ইতিহাসে অবশ্য এ দ্বিচারিণী নীতি রেশ কিছুকাল যাবত চলে আসছে। শুরু সেই ‘প্রভু নয় বন্ধু’র কুখ্যাত ফিল্ডমার্শাল আইয়ুবের আমল থেকে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি অবলম্বনের পরোয়া তারা করেননি। সে কারণে সিয়াটো-সেন্টো ও পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বর্জনের প্রশ্ন নিয়ে তারা মাথা ঘামায়নি। তাই তাদের দু’দিকে তাল দেয়া অসৎ পথে ফায়দা লোটার চেষ্টা মাত্র।
এ জন্য দু’রকমের দালালকে তারা নিয়োগ করল। যখনই কোন সংশয় দেখা দেয়, তখন এরা ছোটে পূর্বে আর পশ্চিমে। পশ্চিমের দরজা এখন অবারিত। থলি পাতাই আছে। কিছু পাঠিয়ে দিলেই হল ঝুপ ঝুপ করে পড়তে থাকবে। ঢাকায় মস্তিষ্ক ধোলাই কারখানা অবজারভার হাউজের মূল গায়েন হামিদুল হক চৌধুরী পিডিপির নায়েব ছদর মি. শিরওয়ানী ওরফে মাহমুদ আলী প্রমুখের তৈল মর্দনের ফলে ওয়াশিংটনে মহাপ্রভুর পাইপ লাইন একেবারে সাফ সুতরো। যা চাইবে চলে আসবে পাইপ লাইনে। সিনেটর বা খবরওয়ালাদের ওজর আপত্তিতে কোন কাজ হবে না। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বাংলাদেশের পঁচানব্বই লক্ষাধিক শরণার্থীর দুঃখ দুর্দশার কথা যতই বলুন, সিনেটর ফুলব্রাইট সামরিক সাহায্য বন্ধ করে দেয়ার জন্য খসড়া প্রস্তাবই তুলুন না কেন, কিছু যায় আসে না।
ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র পশ্চিমা কাউবয়দের জন্য দেশের গোচারণ ক্ষেত্রের চিরকালের জন্য লিজ দিতেও প্রস্তুত। শুধু ১৯৭১ সালেই নয়, আরও কয়েকবার প্রায় একই ধরনের ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে সাবেক প্রেসিডেন্ট জনসন আর আইয়ুব খানের আমলে। প্রথম চোটে চাকরি গেল ইনফরমেশন সেক্রেটারি কুদরুতুল্লাহ শেহাব আর ফরেন সেক্রেটারি এসকে দেহলভির। এদের অপরাধ তৈল মর্দন ঠিকমত হচ্ছিল না। দ্বিতীয়বারে ধরাশায়ী হলেন খোদ মিনিস্টার ভুট্টো সাহেব। আর তাঁর সঙ্গে ফরেন সেক্রেটারি আজিজ আহমদ। এভাবে পাকিস্তানের জঙ্গী চক্র মার্কিন বিরাগভাজন অফিসারদের সঙ্গে সঙ্গে তাড়িয়ে দিয়ে প্রশাসনযন্ত্রকে শোধন করে ওয়াশিংটনের মহান প্রভুদের ভজনা করেছে। এবারের পঁচিশে মার্চের পর ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেলের দফতরটি বড় বেশি বেঁকে বসেছিল। একের পর এক রিপোর্ট পাঠাতে লাগল বাংলাদেশের গণহত্যার বিবরণ দিয়ে।
ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড শরণাপন্ন হলেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের। জরুরী তলব করল কনসাল জেনারেল আর্চাট ব্লাডকে। অন্যদিকে ঢাকার মস্তিষ্ক ধোলাই কারখানার সেই চৌধুরী সাহেব দৌড়ালেন নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটনের পথে ইয়াহিয়ার গোপন বার্তা নিয়ে। তবে এবার তৈল বা মবিলে বিশেষ ফল হল না। হবেই বা কী করে? লক্ষ-লক্ষ লোককে খুন করা হয়েছে। তাই ব্লাড সাহেবের উল্টোপাল্টা রিপোর্ট। দু’য়ে মিলে মার্কিন জনমত পুরোদস্তুর আগুন। তোমরা চাইলে একেবারে ভিটেমাটি থেকে শুরু করে তোমার কাউবয়দের জন্য গোচারণ ভূমি পর্যন্ত লিজ দিতে প্রস্তুত আছিÑ একথাও বলতে হল।
তারপরেও মহাপ্রভুর প্রাত্যহিক পদসেবার জন্য নিউইয়র্কে একটি বঙ্গজ দালাল দি গ্রেটকে সব সময়ের জন্য মজুদ রাখা হয়েছে। এতসব করেই না পশ্চিমের পাইপ লাইন পরিষ্কার রাখা গেছে। কিন্তু এবারে গোলমাল লেগেছে পরে। সেই এপ্রিলের আশ্বাসবাণীর পর সেখানকার নেতারা একবারও রা করেননি বাংলাদেশের প্রশ্নে। আমরা এতবার বলেছি, ওরা আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু। বিপদের সময় পাশে এসে দাঁড়াবেন। আমাদের যা দরকার হবে দেবেন। এক কথায় বলতে গেলে প্রায় ওদের মুখপাত্রের মতই আমরা একে একে সবকথা বলেছি, তবুও কোন অভয়বাণী পরে আজও এল না। বরং উল্টোসিধা নানা কথা আমাদের কানে ভেসে আসছে। এই তো পিংপং খেলায় ওদের একজন সহকারী প্রধানমন্ত্রী আমাদের শত্রু দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা এমনভাবে বললেন যে, সেটা যেন মরমে এসে বিঁধে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা অসহ্য অন্তর্জ্বালায় ভুগছি, এভাবে বেশিদিন চললে সত্যি-সত্যি পুড়তে হবে। এসব কিছু ফয়সালার জন্যই তো ভুট্টোকে পাঠিয়েছি ওদের দেশে। এ লোকটি তো ওদের বন্ধু বলেই পরিচিত।
হ্যাঁ, ইয়াহিয়া খান ঠিকই ধরেছেন। ভুট্টো ছাড়া আর কেউ বামপন্থীর ভেক নিয়ে জল্লাদদের সাহায্য করার জন্য এভাবে এগিয়ে আসার সাহস করবে না। কারণ, ভুট্টো সাহেবের রাজনীতির সমগ্র জগতটা গড়ে উঠেছে এমনিভাবে। জুনাগড়ের এককালের প্রধানমন্ত্রী স্যার শাহ নেওয়াজ ভুট্টোর পুত্র জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনীতিতে হাতেখড়ি মীর জাফরের বংশধর ইস্কান্দার মির্জার কাছে। মির্জাই তাকে নিয়ে এসেছিলেন মন্ত্রী করার জন্য। কিন্তু মির্জা আইয়ুবের কাছে আউট হওয়ার পর ভুট্টো হলেন আইয়ুবের মন্ত্রী। একটানা প্রায় দশ বছর মন্ত্রীগিরির পর আরেকদিন আইয়ুবই তাকে গর্দান ধরে বের করে দিয়েছিলেন।
মন্ত্রীত্বের এ দশ বছরের একদিকে তিনি যেমন আইয়ুবী মহাকীর্তন করেছেন, অন্যদিকে তেমনি দ্বিচারি পররাষ্ট্রনীতিতে একটা মনোহারি পোশাক পরানোর কোশেস করেছেন। এজন্য তাকে একাধিকবার সরকারীভাবে বা গোপনে বেজিং সফর করতে হয়েছে। এমনকি আইয়ুবী আমলে এক সময় তাঁকে পুবের লোক বলে সাধারণের মধ্যে একটা ধারণা জন্মে যায়। কিন্তু অচিরাত ওটা মিথ্যে প্রমাণ হল। দেখা গেল আইয়ুব খান ভুট্টোকে গলাধাক্কা দিলেও চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কোন হেরফের হয়নি।
ভুট্টোও এজন্য চীনাদের পথে বসাতে ছাড়েননি। বিগত সাধারণ নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির সাফল্যের পর তিনি মার্কিন সাংবাদিকদের তার লারকানার সুরম্য প্রাসাদে ডেকে নিয়ে বলেন, একমাত্র আমিই পারি পাকিস্তানে কমিউনিজম ঠেকাতে। মার্কিনীরা যেন এটা ভুলে না যায়। মার্কিনীদের এটা ভুলে যাওয়ার সঙ্গত কোন কারণও নেই। তাই তাদের আদমি ইয়াহিয়া এবার পিকিং-এ দরবার করার জন্য বামপন্থীর ভেকধারী ক্ষমতালোলুপ ভুট্টোকে পিকিং পাঠিয়েছে। যা করে হোক পিকিংয়ে একটা কিছু করতে হবে। তা না হলে ক্ষমতা কিন্তু পাবে না। কিন্তু ক্ষমতা ভুট্টো সাহেবের পাওয়া তো দূরের কথা, খোদ ইয়াহিয়া খান রাখতে পারেন কি-না তারই ঠিক নেই। একে তো বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বার আক্রমণ, তরপর বেলুচ আর পাঠান মুল্লুকের অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। তারা পূর্ণ স্বরাজের দাবি তুলেছে। লন্ডনের অবজারভার পত্রিকার পি-ির সংবাদদাতা কলিন স্মিথ এ খবর দিয়েছিল। তিনি বলেছেন, খাইবার গিরিপথ অঞ্চলের উপজাতীয় এলাকার বিশ হাজার লোক গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। শীঘ্রই তারা নাকি পাকিস্তান আক্রমণ করতে পারে।
অতএব, ইয়াহিয়া খান সাহেব, ভিক্ষার জন্য আপনি পূর্বেই হাত বাড়ান আর পশ্চিমে হাত বাড়ান, আপনার দু’হাতই এখন কাটা পড়ার উপক্রম হয়েছে। ভুট্টো মাহমুদ আলী, হামিদুল হক, নুরুল আমিন, মওদুদী, কাইয়ুম খা এরা কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।

ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে
এতসব করেও বোধহয় শেষ রক্ষা হল না। হাড্ডির টুকরো প্রায় ফসকে যায় আরকি। তলোয়ার আলী ভুট্টো ওরফে জুলফিকার আলী ভুট্টোর আশার ফানুস উড়িয়ে যেভাবে পিকিং গিয়েছিলেন তা চুপসে গেছে। ইসলামাবাদেও উল্লাসের পরিবর্তে নৈরাশ্যের ছায়া নেমে এসেছে। ভুট্টো সাহেব পিকিংয়ে বিশেষ পাত্তা পাননি। তিনি পি-ি ফিরে যতই গলাবাজি করুন আলোচনা সফল হয়েছে, ইয়াহিয়া খান একই মুখে দু’রকমের কথা যতই বলুনÑ প্রথম দফায় চীন হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য সব সাহায্য দেবে। দ্বিতীয় দফায় চীন হস্তক্ষেপ করবে বলুন না কেন, দুনিয়ার মানুষের কাছে আজ এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, পিকিংয়ের শরণাপন্ন হয়েও তলোয়ার আলী সাহেব এমন কিছু আনতে পারেননি, যাতে ইসলামাবাদের জঙ্গী শাসকরা পুলকিত হতে পারেন। লন্ডনের দি টাইমস ও বিবিসির মতে, পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের চীন সফর শেষে কোন যুক্ত ইশতেহার প্রকাশ না হওয়া থেকে এটা স্পষ্ট বুঝা যায়, চীন পুরোপুরি পাকিস্তানী অভিমতের সঙ্গে একমত হতে পারছে না। এ অভিমতের পক্ষে একাধিক যুক্তি পেশ করা হয়েছে। (১) চীন-পাকিস্তান আলোচনা শেষে কোন যুক্ত বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। চীন যদি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ ও এ উপমহাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে একমতই হবে তবে যুক্ত বিবৃতিতে না করার পেছনে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। যুক্ত বিবৃতি প্রচার করা হলে পাকিস্তান অন্তত সুখী হত। (২) এখন এটা পরিষ্কার ইসলামাবাদের অনুরোধেই পাক প্রতিনিধি দলের পিকিং যাত্রা স্থির হয়। পিকিং পাকিস্তানকে কোন আমন্ত্রণ জানায়নি। (৩) বাংলাদেশের গণহত্যা ও মুক্তি সংগ্রামকে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে পরিণত করার জন্য ইসলামাবাদ কয়েকমাস ধরে এ উপমহাদেশের পরিস্থিতি রাষ্ট্রসংঘে তোলার চেষ্টা করে আসছে। তাই চীন-পাকিস্তান মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দাবি করেও ভুট্টো সাহেবকে বলতে হয়েছে, রাষ্ট্রপুঞ্জে বিষয়টি নিয়ে গিয়ে কোন লাভ হবে না।
সব চাইতে বেকায়দায় পড়েছেন তিনি অস্থায়ী চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. চেং পেং এর বাংলাদেশ সম্পর্কিত বক্তব্যটি নিয়ে। তিনি পাকিস্তানকে বাংলাদেশ সমস্যার যুক্তিসঙ্গত সমাধান করতে বলেছেন। অন্যদিকে, চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পিকিংয়ের ভোজসভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় বাংলাদেশ সমস্যা বা পাক-ভারত সম্পর্ক কোন কিছুরই উল্লেখ করেননি। চৌ-এর সম্মানে ভুট্টো সাহেব এ ভোজের আয়োজন করেছিলেন। ভুট্টো সাহেবের বোঝা উচিত ছিল, এটা ১৯৭১ সাল, ১৯৬৫ নয়। এ কয়বছরে ইয়াংসীর উত্তাল তরঙ্গমালায় অনেক সূর্য জ্বলেছে-নিভেছে। আসলে ভুট্টো এ্যান্ড কোম্পানি অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি শঙ্কিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তাই তিনি বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিস্থিতি আয়ত্ত্বে আনতে হবে অবস্থা স্বাভাবিক হোক আর নাই হোক।
এ জন্য তিনি ১০৭ পাতার একটি বইও লিখে ফেলেছেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পিপলস পার্টি ভুট্টোর ‘ দি গ্রেট ট্রাজেডি’ নামের এ বইটি প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম তথা গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপারে ভুট্টো সাহেব এতই শঙ্কিত যে তিনি জল্লাদ বাহিনীকে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ পরিহার করার নসিহত দিয়েছেন তার বইয়ে। তা না হলেই মুসিবত। বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) আরও সৈন্য আমদানি করতে হবে এবং এর কোন পরিসমাপ্তি নেই। ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাংক অনির্দিষ্টকাল ধরে ব্যবহার করা যাবে না।
কেন ভুট্টো সাহেব, আপনার প্রভু ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনীর মনোবল কি একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে, নাকি ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাংকে উঠতে পারছেন না এর জবাব অবশ্যই তার বই থেকে পাওয়া যাবে। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাহারা দিতে পারে না বা প্রতিটি নাগরিকের পেছনে একজন করে সৈন্য মোতায়েনও সম্ভব নয়। আরও আছে, বাংলাদেশের বিরাট জনসংখ্যা, সমতল ভূমি ও বিক্ষুব্ধ জনসমষ্টি গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রকৃষ্ট ক্ষেত্র। তাই তিনি জল্লাদ বাহিনীর উদ্দেশে বলেছেন, যদি দেরি করে ফেলো তবে গেরিলাযুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।
এটা যাতে না ঘটতে পারে সেজন্য তো আপনি কম কোশেস করেননি ভুট্টো সাহেব। বাংলার মানুষ আপনার প্রভুর নির্দেশমতো কাঠামোর মধ্য থেকে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন এবং নির্বাচিত করেছিল আওয়ামী লীগকে। বাংলার মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার এ ধরনের প্রকাশ্য অভিব্যক্তি আপনি বরদাস্ত করতে পারেননি। তাই তো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন যাতে না বসতে পারে তার জন্য আপনি আদাজল খেয়ে লেগেছিলেন। হুমকি দিয়েছিলেন এ অধিবেশনে যোগদানকারী পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের ধরাপৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার।
তাই শুধু নয়, মার্চের শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকুল আবেদন আপনি কিভাবে অগ্রাহ্য করেছিলেন তাও দেশবাসীর অজানা নয়। আপনি নিজেই বলেছেন, ‘ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনার পর বেরিয়ে যাওয়ার মুখে মিলিটারি সেক্রেটারির কক্ষে ঢুকতেই শেখ মুজিব আমার হাত ধরে পাশে বসালেন এবং বললেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং এ সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার সাহায্য চাই। সঙ্কট সমাধানে তার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে শেখ আমাকে সেনাবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বললেন।
তিনি বললেন, ‘সেনাবাহিনী যদি আমাকে হত্যা করে তবে তোমাকেও তারা ছাড়বে না’। বঙ্গবন্ধুর এই সৎ পরামর্শ আপনি গ্রাহ্য করেননি। একটি জাতিকে জঘন্যতম গণহত্যা থেকে বাঁচানোর আকুল আবেদনে সাড়া দেননি। দেবেনই বা কি করে। আপনি তো আগে থেকে গাঁটছড়া বেঁধে রেখেছিলেন টিক্কা ওমর আকবর গুল হাসান পীরজাদা হামিদ প্রমুখ জেনারেল চক্রের সঙ্গে। বাংলার মানুষের দাবি মেনে নেয়ার চেয়ে তাই তো আপনি সেনাবাহিনীর পক্ষ গ্রহণ শ্রেয় বলে মনে করেছেন।
এজন্য নির্লজ্জের মতো বলতে পেরেছেন, রাত সাড়ে দশটার দিকে নৈশভোজ শেষ করে আমরা কক্ষে ফিরে এলাম। কয়েকজন বন্ধুও আমার রুমে এলেন। ঘণ্টাখানেক পর কামানের গোলার আওয়াজ আমরা শুনতে পেলাম। হোটেলের কক্ষ থেকে তিন ঘণ্টা ধরে সেনাবাহিনীর অপারেশন দেখলাম। একটার পর একটা বাড়ি জ্বলছে। ইংরেজী সংবাদপত্র ‘দি পিপলস’ অফিস ধ্বংস করতে দেখলাম।
গুনের লেলিহান শিখায় আকাশ লাল হয়ে গেল, চারদিকে ধ্বংস আর মৃত্যুর বিভীষিকা, আশ্চর্য ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী এ বীভৎস হত্যালীলা আপনি শুধু নীরবে অবলোকন করলেন! কই, আপনার প্রভুর কাছে এর প্রতিবাদ করার বিন্দুমাত্র সাহস আপনার হলো না। আপনি বলেছেন, ইতিহাসের কাছে মার খাওয়ার চেয়ে সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুবরণকে শ্রেয় বলে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাস আপনাকে ক্ষমা করবে না। দুনিয়ার একটি নৃশংসতম গণহত্যার দোসর হিসেবে ইতিহাস আপনাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে।

নয়া দাওয়াই
ইয়াহিয়া খানের অতি সাধের পিতলের কলসিটি তৈরি হওয়ার আগেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। অতি সঙ্গোপনে একদল আমলা বিশেষজ্ঞ দিয়ে একেবারে রেডি করে জাতীয় পরিষদ নামক একটি জি হুজুরদের সংস্থার কাছে পেশ করা হবে বলে ফরমান জারি করা হয়েছিল। কাকপক্ষীতে না জানলে কি হবে, ফেউরা তার কিছু কিছু ফাঁস করে দিতে শুরু করেছে। জবরদস্ত জঙ্গী শাসক ইয়াহিয়া খানের নিজের তত্ত্বাবধানে বিশুদ্ধ আমলা দ্বারা প্রস্তুত। খাঁটি প্রমাণে হাজার টাকা ইনাম।
ডিরেক্টরের ছুড়ে দেয়া ‘গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রটি’ আসলে সে কি চিজ হবে সামরিক চক্রের এক নম্বর ফেউ নুরুল আমিন তা ইতোমধ্যেই ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি যা বলেছেন তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, শাসনতন্ত্র নামক এই বস্তুটিতে সাম্প্রদায়িক নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকবে। ইসলামী জঙ্গী জোশে উন্মুক্ত ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী আর তার সরকারের কাছ থেকে এর চেয়ে আর বেশি কিছু আশা করা যায়? বাংলাদেশের মানুষ এতে বিস্মিত না হলেও ইয়াহিয়ার মহাপ্রভুরা নিশ্চয়ই কিছুটা আশ্চর্যই হবেন।
কারণ তাদের দেশের পত্রিকাগুলোর সঙ্গে সাক্ষাতকারে জল্লাদ দলের এ সরদারটি দু’দিন আগেও বাংলার মানুষের হতাশা পুষিয়ে দেয়ার বড় বড় কথা বলেছিল। মহাপ্রভুর দেশের সাধারণ মানুষ অবশ্য জানেন, ওই বড় বড় বুলি ফরেন কনজামশনের জন্য, ইমেজ ঠিক রাখার জন্য। তাই ফরেন ইমেজ সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত খোলসটি খসে পড়তেই পি-ির গায়ের ডোরাকাটা দাগগুলো বের হয়ে পড়েছে। আর সোনার পিতলের কলসিটির মধ্য থেকে একের পর এক বের হয়ে আসছে বাঙালীদের পদানত করে রাখার ফন্দি-ফিকির।
বাংলাদেশের মানুষ, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ বহুদিন আগেই পৃথক নির্বাচন তথা সাম্প্রদায়িক নির্বাচনের মধ্যযুগীয় প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবীয় সামরিক অভ্যুত্থানের বেশ কয়েক বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম সোহরাওয়ার্দী সাহেব যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংবলিত একটি বিল জাতীয় পরিষদে পেশ করেন এবং বহু বিতর্কের পর এ বিল গৃহীত হয়। এ বিল পেশকালে তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা আজও গণতন্ত্রকামী মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রেখেছেন।
তিনি পৃথক তথা সাম্প্রদায়িক নির্বাচনী ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করে যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখিয়ে বলেছিলেন, যে রাজনৈতিক বা নির্বাচনী ব্যবস্থা জনসংখ্যার একাংশকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে এবং এভাবেই ডিভাইড এন্ড রুল করার এ নীতি চালিয়ে যায় তা আমরা মানি না, মানতে পারি না। এরপর পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আইয়ুব কর্তৃক পাকিস্তানের সার্বিক কর্তৃত্ব গ্রাস, আবার মঞ্চ থেকে তার প্রস্থান এবং ইয়াহিয়ার আবির্ভাব এসব ঘটে গেছে। কিন্তু কেউ-ই এ পর্যন্ত যুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেননি।
একমাত্র জামায়াতে ইসলামীই এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম। জামায়াতে ইসলামী মুসলমানের এক কথার মতো দুনিয়ার যত কিছু প্রগতিশীল তা সব সময় বিরোধিতা করে এসেছে। এমনকি আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনও হয়েছে যুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থার আওতায়। পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল যুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়েছিল।
কিন্তু বিগত সাধারণ নির্বাচনে বাঙালীদের অভূতপূর্ব ঐক্যবোধ এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাংলার মানুষের একটি জাতি হিসেবে ঐক্যের পাহাড় সৃষ্টির ক্ষমতা দেখে পাকিস্তানের আসল শাসনকর্তা পশ্চিমা সামন্তপ্রভু একচেটিয়া পুঁজিপতি সামরিক জান্তা প্রমাদ গুনতে শুরু করল। তাই এ ব্যাপারে চলল তাদের দ্বিমুখী অভিযান। ২৫ মার্চের কালরাতে চারানো হলো বাঙালীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও বাংলাদেশ দখলের পালা।
অন্যদিকে, জঙ্গী চক্রের তোতা পাখিগুলো বাঙালীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পদানত করে রাখার জন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তার সুপারিশ পেশ করে কাগজে-কাগজে প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করল এপ্রিলের প্রথমদিকে। তোতা বাহিনীর সবচেয়ে বড় গুণধরটি হলো জেডএ সুলেরী। গোলাম মোহাম্মদ ইস্কান্দর মির্জার হাতে গড়া আইয়ুবের পদলেহী ইয়াহিয়ার অনুকম্পাভোজী এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের প্রধান মেজর জেনারেল আকবরের এক নম্বর ইনফরমার সুলেরীর পক্ষে হেন অপকর্ম নেই যা সে করতে পারে না। কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া... এ নীতি ভদ্রলোক অনুসরণে রাজি যদি কানা বা খোঁড়া প্রভু হয় অথবা তাদের কাছে টু-পাইস প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা থাকে। যাই হোক এ দালাল সাংবাদিক পাকিস্তান টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে বসলেন এবং তা ফুল সিরিয়ালে চলল।

এতে পাকিস্তানের তথাকথিত সংহতি ও অখ-তা কেন বিপন্নতার কারণ হিসেবে বলা হলো, উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েই ভুল করা হয়েছে। ‘এমন যে জিন্নাহ সাহেবের কথায়ও কোন কাজ হয়নি। জিন্নাহ সাহেব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষ সমর্থনের জন্য বারশ মাইল দূর থেকে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে ছুটে এসেছিলেন ঢাকায়। তাও মান্ধাতা আমলের একটি ড্যাকোটা বিমানে চেপে।’ এগুলো সুলেরীরই কথা। তার মতে, উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়াতে বাঙালীরা পাকিস্তানী হওয়ার পরিবর্তে বাঙালী হিসেবে ভাবতে শিখেছে। দু’দেশের দু’অংশের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য অবসানের ওয়াদার কথা বারবার বলাতেও সংহতি বিপন্ন হয়েছে বলে সুলেরী লিখেছেন।
তাই পাকিস্তানের জন্য সুলেরীর দাওয়াই হলো : ১. বাঙালীদের মধ্যে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য ইসলামী তমুদ্দুন তাহজীবের ব্যাপকহারে মদদ দিতে হবে। বাংলা সাহিত্যের ওপর পশ্চিমা বাংলার সাহিত্যের তথাকথিত প্রভাব নির্মূল করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ চলবে না। ২. আঞ্চলিক বৈষম্যের নামে আমাদের সংহতি পরিপন্থী কিছু সহ্য করা হবে না। ৩. বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে হবে। এজন্য পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যায় বাংলাদেশকে ভাগ করে ফেলতে হবে তিনটি প্রদেশে। যাতে বাঙালীরা আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, যাতে সুলেরীর প্রভুদের ডিভাইড এন্ড রুলের সুবিধা হয়। ৪. হিন্দু ও মুসলমানকে একসঙ্গে চলতে দেয়া হবে না। কারণ এর জন্য পাকিস্তান হয়নি। হিন্দুদের আলাদা ভোট থাকবে। থাকবে স্বতন্ত্র প্রতিনিধি। অতএব সাম্প্রদায়িক নির্বাচনের ব্যবস্থা।
সুলেরীর সুপারিশগুলো এক এক করে কাজে লাগানো শুরু হয়েছে। নুরুল আমীনের স্বীকারোক্তিই তার বড় প্রমাণ। এরপর একদিন বাংলার পরিবর্তে উর্দু যদি একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয় তাহলেও আশ্চর্যের কিছুই নেই।
মুসিবতের শেষ নেই
মুসিবতের আর শেষ নেই। একদিক দিয়ে গুটিয়ে আনলে অন্যদিকে বেরিয়ে যায়। জঙ্গী শাসক ইয়াহিয়া খানের এখন লেজেগোবরে অবস্থা। বাংলাদেশের উপ-নির্বাচনী তামাশার আয়োজন করে ভেবেছিলেন একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের ডাক তো ঠেকানো যাবে না। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে খবরের কাগজগুলো। এরই মধ্যে ওরা বলতে শুরু করেছে, এটা নির্বাচনের নামে প্রহসন মাত্র। নিউইয়র্ক টাইমস সাফ বলে দিয়েছে ইয়াহিয়া খানের সামরিকজান্তা তাদের সমর্থক তথা দালালদের বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য উপ-নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছে। এ পত্রিকার ঢাকাস্থ সংবাদদাতা ম্যালকম ডব্লিউ ব্রাউনের মতে, তিপান্নটি আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হচ্ছে না। এ উপ-নির্বাচনী তামাশার সঙ্গে বাংলার মানুষের কোন সম্পর্ক না থাকলেও সবচেয়ে বিশ্বস্ত দালালকে জাতীয় পরিষদে পাঠানোর ব্যাপারে আশ্বস্ত হওয়ার জন্য সামরিকজান্তা ব্যাপকহারে ‘অযোগ্য ঘোষণা’র নীতি গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, দালালদের মধ্যে একটি কনফিডেন্সিয়াল মিটিং হয়ে গেছে। এ গোপন সভায় নুরুল আমিনের মতো দক্ষিণপন্থী দলগুলোর সমস্ত প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। এ সভায় উপ-নির্বাচনে কোন দল কতগুলো আসন পাবে তাও ঠিক করা হয়। সামরিক কর্তৃপক্ষ এ ভাগবাঁটোয়ারা অনুযায়ী অন্য সবাইকে ডিসকোয়ালিফাই করে দেবে। দালালদের ভাগবাঁটোয়ারায় পিডিপি-২৩, জাাময়াতে ইসলামী-১৯, কাউন্সিল মুসলিম লীগ-১২, কনভেনশন ও কাইয়ুম লীগ, নেজামে ইসলামী পার্টি প্রত্যেকে ৮টি করে আসন পাবে। খোদ খান আবদুল কাইয়ুম খান এ খবর দিয়েছেন। দালালিতে দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে কম্পিটিশনে আউট হয়ে গেছে ভুট্টোর পিপলস পার্টি। ভুট্টো সাহেব ইতোমধ্যে হুমকি দিতে শুরু করেছেন, ‘সত্যিকারের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের ওপর যদি কৃত্রিম উপায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাপিয়ে দেয়া হয়, তবে চল্লিশ দিনের মধ্যেই জনগণের সাহায্যে তাদের পতন ঘটানো হবে’। বাংলাদেশে তথাকথিত উপ-নির্বাচনে ইয়াহিয়া খানের এ বেহাল অবস্থায় খোদ পশ্চিম পাকিস্তানে কি ঘটছে তা একটু দেখা যাক।
বাংলাদেশে বিগত পঁচিশে মার্চের পর থেকে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র এখন পশ্চিম পাকিস্তানেও সর্ষে ফুল দেখছে। লন্ডনের রেডমোল পত্রিকায় করাচি থেকে মোহাম্মদ হোসেন লিখেছেন বাংলাদেশের যুদ্ধের ঘটনা। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পসমূহের প্রতিটি শাখায় অবিরাম মন্দা দেখা দিয়েছে। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, বাংলাদেশে ব্যাপক সৈন্য মোতায়েনের ফলে খরচ বেড়ে গেছে বিপুল পরিমাণে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম পাকিস্তানে উৎপন্ন পণ্যের বাজার বাংলাদেশে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াহিয়ার দেশীয় মাতব্বর শিল্পপতিরা এ মন্দার সমস্ত বোঝাই শ্রমিক-কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। আর দুষ্কর্মে সাহায্য করেছে ইয়াহিয়ার বাহিনী। এ ধরনের ক্রিয়াকর্ম চলেছে সরকারী-বেসরকারী উভয় খাতেই। সরকারী খাতের ব্যয় বরাদ্দ ব্যাপক হারে হ্রাস করা হলে শতকরা আশি থেকে পঁচাশি ভাগ লোক উদ্বৃত্ত হয়ে পড়েছে। আর বেসরকারীভাবে ব্যাংক, ব্যাটারী প্রস্তুতকারী শিল্প, কাপড় কল, চিনিকল প্রভৃতি শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। শিল্পপতিরা তাই কলকারখানায় হয় লক আউট ঘোষণা করেছে, বন্ধ করে দিচ্ছে। না হয় সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছে। কারখানা থেকে ছাঁটাই আর জমি থেকে উৎখাত এখন শ্রমিক-কৃষকের নিত্য সহচর।
মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত বস্ত্রশিল্পেই চার লাখ শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছে। বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামালের দাম দারুণভাবে বেড়ে গেছে। করাচির মোহাম্মদ হোসেনের মতে, কাঁচা তুলার দর শতকরা পঞ্চাশ ভাগ, ব্যাটারী চারশ শতাংশ, সুতি বস্ত্র পঁচিশ শতাংশ, পেট্রোল পঁচিশ শতাংশ, মাংস একশ শতাংশ, তেল ত্রিশ শতাংশ, দিয়াশলাই একশ শতাংশ, সাবান তেত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতির স্থবিরতা যে কি পর্যায়ে পৌঁছেছে শেয়ার বাজারের মূল্য হ্রাস, সমস্ত রকমের শিল্প প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থের ছাঁটাই এবং অত্যাবশ্যক সরঞ্জামের ক্রমাগত দুষ্প্রাপ্যতা থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ইয়াহিয়ার সৈন্যদল যখন নাজেহাল সে সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থা তো এই। আর এ উপসর্গ যোগ হয়েছে ইয়াহিয়া খানের রাজনৈতিক জুয়া খেলায়। পশ্চিম পাকিস্তানের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কিছু কিছু রাজনীতিক ও শ্রমিক নেতা সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিক বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে।
- See more at: http://www.dailyjanakantha.com/details/article/314443/%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AA-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0#sthash.EkWC3xS1.dpuf

Saturday, June 16, 2018

দেশ কিভাবে চলছে? বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের সেই শোষিত নিস্পেষিত লাঞ্ছিত মানুষগুলো কি আসলেই শোষনহীন সমাজব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সুফল পেয়েছে?

দেশ কিভাবে চলছে? বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের সেই শোষিত নিস্পেষিত লাঞ্ছিত মানুষগুলো কি আসলেই শোষনহীন সমাজব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সুফল পেয়েছে? প্রতিটি মানূষের গায়ে লেগেছি কি সার্বভৌম বাংলাদেশের উন্নয়নের ছোয়া, প্রতিটি মানুষ কি ভালো আছে যারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল বা যারাই বিলিয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল? আওয়ামী লীগ সব করেছে, সব দিকেই জয় জয়কার; উন্নয়নের জোয়ার অস্বীকার করার উপায় নেই; অস্বীকার করার উপায় নেই যে আজ মঙ্গা নেই মন্দা নেই নেই ভাতের হাহাকার। কিন্তু একাত্তুরের সেই সোনার ছেলেরা কি ভালো আছে বা তারা কি তাঁদের ন্যায্য অধিকার মর্যাদা ও সন্মান পেয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের নিকট থেকে। পায়নি। তাহলে কি দাড়ালো যোগ ফল?

"আপনি বাজার থেকে সেরা মাছ মাংস অনেক দাম দিয়ে কিনে আনলেন, সাথে তরী তরকারী পিয়াস রসুন হলুদ মরিচ সবকিছু। আপনার গিন্নীও ভালো রন্ধনশিলা মহিলা। তার হাতের খাবার একবার খেলে আবারো খেতে ইচ্ছে করে; তাই তিনি খুব খুশি হয়ে মনোযোগ দিয়ে রান্না করলেন কিন্তু এক সময় বাচ্চা কেদে উঠলেন তিন দৌড়ে গেলেন বাচ্চাকে দুধ দিতে আর এদিকে ভুলেই গিয়েছিলেন যে স্বামীর এতো ব্যাপক আগ্রহ ভরে ছুটির দিনে মনের মত খানা খাবার ইচ্ছায় বাছাই করা বাজার রান্না করার সময় তরকারীতে লবনই দেয়া হয়নি"
মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে তাই হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী>আওয়ামী লীগ অনেক কিছু করেছে কিন্তু তরকারীতে লবন দেয়নি।।

তাহলে কেন ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল, কেন ২ লক্ষ ৪০ হাজার মা বোন তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছিল, কেন বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হল, কেন জাতীয় ৪ নেতা নীতির সাথে আপোষ না করার নীতিতে অটোল থেকে স্ত্রী কন্যা পুত্র সন্তান আত্মীয় পরিজন ছেড়ে জেলের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে সকলের অজান্তে জীবন বলিদান দিয়েছিলেন?

কতিপয় অসাধু তোষামোদকারী চাটুকর দালাল লেজুড়বৃত্তির সুবাদে ক্ষমতায় এসে যুগে যুগে জাতিরজনকের নাম ভাঙ্গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের দোহাই দিয়ে বিত্ত সন্মান যশ প্রতিপত্তি লুন্ঠন করে গেলো সমাজে মাথা উচু করে মাইক ফাটিয়ে লম্বা মিথ্যা ভিত্তিহীন বানোয়াট কল্প কাহিনী বলে যা'তারা নিজের ব্যক্তি জীবনে মানে না, নিজে যে নীতিকে শ্রদ্ধা করে না, নিজে যে আইন নিয়ম শৃঙ্খলা শিষ্টাচার ভুলেও অন্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে না; সে সকল অসাধু ভন্ড প্রতারক জালিয়াত জোচ্চর মিথ্যাবাদী স্বদেশীয় হায়েনা ক্ষমতায় আসে, আমরা ভোট দেই ঐ একটি ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, একটি বিশ্বাসে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে হয়তো আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আরো এগিয়ে যাবে।Image may contain: 1 person, text

আরো বেকার সমস্যার সমাধান হবে; বন্ধ হবে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি হিংসা হানাহানি; জননেত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছে মত প্রতিটি মানুষ তাঁদের ন্যায় বিচার পাবে, অধিকার পাবে; প্রতিটি মানুষ পাবে তাঁদের নাগরিক অধিকার; শেখ হাসিনা একজন আর চাটুকর তোষামোদকারী লেজুড়বৃত্তির ধারক ও বাহক সুবিধাবাদী লক্ষ কোটি জন; একা শেখ হাসিনা কতজনের বিচার করবেন, কতজন কে বহিস্কার করবেন, কতজনকে কাছে টানবেন; কতজনকে অন্যায় অপরাধের জন্য ভুলের জন্য দুর্নীতির জন্য স্বজনপ্রীতি অবিচারের জন্য শাসন করবেন; তারপরেও তিনি করছেন এবং ভিতরে ভিতরে অনেকেই নেত্রীর প্রতি নাখোশ কিন্তু মূখে বলেন না;

নেত্রীর মূখ থেকে একটি নির্দেশ বেড় হলে তা'বাস্তবায়ন হয়না বহু কারনে; আমি নিজে কালের স্বাক্ষী এমনো হাজারটি বিষয়ের বাস্তব ঘটনা প্রবাহের।

Friday, June 15, 2018

কে বিচার করে? কে করে বিশ্লেষন, সবাই যে ব্যস্তজন।

যারা সেনা সদস্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের কোন প্রশিক্ষন নিতে হয়নি; তাই বলে বেসামরিক যোদ্ধাদের চেয়ে তাঁদের অবদান বেশী নয়; তারপরেও তারাই হলেন ৭ জন বীর শ্রেষ্ঠ; 
রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি আর হবেও না। বঙ্গবন্ধু নিজেই অনুমোদন দিয়ে গেলেও প্রস্তাবক ব্রিগেডিয়ার আমিন উদ্দিন আহমেদ চৌধূরী কে এম শফিউল্লাহ ইচ্ছে মতই মহান স্বাধীনতার সকল শ্রেষ্ঠতম প্রশংসার সনদ ছিনিয়ে নিলেন বেসামরিক যোদ্ধাদের নিকট থেকে। 
সাবেক এম পি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মোহসীন আলী সাহেব ঠিক কথাটিই বলেছিলেন। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসীব করুন। আমিন

জীবনীঃ

সৈয়দ মহসীন আলীর বাবার নাম সৈয়দ শরাফ আলী। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। সৈয়দ মহসীন আলীর মায়ের নাম আছকির”নন্নেছা খানম। মৌলভীবাজার থেকে ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে তিনি কলকাতা চলে যান। কলকাতার আলীপুরে ছিলো তার বিশাল বাড়ি। আলীপুরের সেই বাড়িতে ১৯৪৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৫ ভাইদের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন। সৈয়দ মহসিন আলীর শিক্ষা জীবন শুর” হয় কলকাতায়। তিনি কলকাতার সেন্টজেবিয়ার্স স্কুলে জুনিয়র কেমব্রিজ ও সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেন। পরবর্তীকালে আবার বাংলাদেশে এসে বাংলা মাধ্যমে কিছুদিন পড়াশুনা করেন। তবে আবারও তিনি কলকাতা থেকে ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা করেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশমাতৃকার প্রতি তার মমত্ববোধের কারণে স্বত:স্ফুতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। সম্মুখসমরে যুদ্ধ চলাকালে গুলিবিদ্ধও হয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সিলেট বিভাগে সিএনসি স্পেশাল ব্যাচের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাজ করেছেন যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ গঠনেও। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।
মৌলভীবাজার মহকুমার রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিতে তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগ যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে জেলা আওয়ামী লীগেরও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতাত্তোরকালে তিনিই একমাত্র জননেতা যিনি পৌরসভায় পর পর ৩ বার বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে তাকে শ্রেষ্ঠ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করে।

২০১৪ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছেন। সেখানে এখন বহুমুখী বাস্তবসম্মত প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য তিনি ভারতের নেহের” সাম্য সম্মাননা ও আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন সম্মাননা স্বর্ণপদক লাভ করেন।
সাহিত্য ও সাংবাদিকতা ছিলো তার পছন্দের বিষয়। অবসরে তিনি বই পড়তে ভালবাসতেন। কবি-লেখকদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। দেশের বড় বড় সাংবাদিকদের অনেকেই ছিলেন তার ব্যক্তিগত বন্ধু। তিনি এক সময় বাংলাদেশ টাইমসের প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। একজন সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজের সম্পদ বিক্রি করে রাজনীতি করেছেন বলে তাঁর সুখ্যাতি ছিলো।

LikeShow more reactionsCommentShare

লীডার পড়ুনঃ কাজে লাগবেঃ মোকতেল হোসেন মুক্তি

লীডার পড়ুনঃ কাজে লাগবেঃ মোকতেল হোসেন মুক্তি

স্বাধীনতাবিরোধী জামাত শিবিরের গুপ্তহত্যা বন্ধ হয়নি; যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের কারনে এ হত্যাকান্ড এখনো চলছে। সুমন হত্যা তার প্রমান! ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিষ্ট। যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিয়েছে, যারাই ওদের ফাঁসির জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচার সভা সমিতি সেমিনার করে বিশ্ব ও দেশবাসীসহ সরকারকে উৎসাহ প্রদান ও কাপজপত্র দলিল পত্র ছবি ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছে; তাদেরকে এবং তাঁদের বংশের চিনহ বাংলার মাটিতে এই জামাত শিবির রাখবে না-এর জন্য এসেছে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তান থেকে বড় ধরনের বাজেট অস্ত্র ও প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত জংগির বহর।

গোপনসূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় এরা বর্তমানে আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির চোখ ও নজরদারী এড়িয়ে যাবার চতুর ও ধূর্ত কৌশল অবলম্বন করেই সারা দেশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শাখা কমিটিতে বড় অংকের উতকোচ প্রদানের মাধ্যমে নেতাদের মন জয় করছে এবং আওয়ামী লীগের আসল ত্যাগি তৃনমূল নেতা কর্মীদের চেয়ে গভীর ও প্রচন্ড দেশ প্রেম বঙ্গবন্ধু প্রেম ও নৌকার জয়ও গাণে মাঠ দখল করছে। বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাও ভাবছে এবং কঠোর নজরদারীর মাধ্যমে সাবেক তালিকাভুক্ত জঙ্গিদের সংমিশ্রন ও সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে।
সূত্র আরো জানায় যে লন্ডনে অবস্থানরত জঙ্গিদের সাথে তারেক রহমানের সন্তোষজনক সমঝোতার সুবাদেই এ ধরনের গুপ্ত হত্যার একটি স্কীম নিয়ে জঙ্গিরা বাংলাদেশে অবস্থান করছে তবে এর সাথে শুধু জামাত বি এন পি নয়, এর সাথে রয়েছে হুজি জেমবি বাংলা ভাই (আন্সারুল্লাহ) ও অন্যান্ন নতুন নতুন ক্ষুদ্র জঙ্গি সংগঠনসমূহ।

আশংকা করা হচ্ছে আসন্ন ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের জাতীয় পর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা কর্মীকে হত্যা করা হবে অতি কৌশলে যার কোন ক্লু গোয়েন্দা সংস্থা খুজে বেড় করতে হিমশিম খাবে। 
সাবধান!

LikeShow more reactionsComment

রেললাইনের পাশে শহীদ সাংবাদিকের ছেলের লাশ ► যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজে স্বাক্ষী হওয়ার মাসুল দিল সুমন ► মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী ছিলেন সুমন ► পরিবারের অভিযোগ পরিকল্পিত হত্যা

রেললাইনের পাশে শহীদ সাংবাদিকের ছেলের লাশ
► যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজে স্বাক্ষী হওয়ার মাসুল দিল সুমন 
► মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী ছিলেন সুমন
► পরিবারের অভিযোগ পরিকল্পিত হত্যা
Image may contain: 1 person, hat, sunglasses and outdoor
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাগিচা এলাকায় রেললাইনের পাশ থেকে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের (৫৬) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রেললাইনের পাশ থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। 
সুমন জাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী ছিলেন। ট্রেনে কাটা পড়ে তিনি মারা গেছেন বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও নিহতের পরিবার। পরিবারের সদস্যরা জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দেওয়ায় সুমন একাধিকবার হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন। গতকাল সকালে তাঁকে বাসা থেকে কে বা কারা ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, সুমন ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ফেনী। স্ত্রী টুইসি এবং দুই ছেলে স্মরণ ও সুমন্দ্রকে নিয়ে উত্তর শাহজাহানপুর এলাকায় থাকতেন তিনি। স্মরণ টিঅ্যান্ডটি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আর সুমন্দ্র আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সুমন জাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন। চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক আশরাফুজ্জামান উভয়কেই শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
নিহতের বড় ভায়রা এ টি এম এমদাদুল হক বুলবুল বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কে বা কারা সুমনকে উত্তর শাজাহানপুরের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপরই রেললাইনের পাশে তাঁর লাশ পাওয়ার খবর শোনা যায়। সুতরাং তাঁকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমদাদুল হক বুলবুলের অভিযোগ, ‘সুমনকে এর আগেও বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। দুই বছর ধরে তিনি অনেকবার হুমকি পেয়েছেন। তাই আমরা ধারণা করছি, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, আজ (গতকাল) সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে চলে যাই। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে সুমন জাহিদের স্ত্রী টুইসির ফোন পেয়ে দ্রুত ছুটে যাই তাঁদের বাসায়। তাঁর পরিবারের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় বাইরে। আট বছর বয়সে সুমন জাহিদের সামনেই তাঁর মা সেলিনা পারভীনকে আল বদররা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে শুরু তাঁর সংগ্রামী জীবন। স্কুটার চালিয়ে লেখাপড়া করেছেন। শত সংগ্রামের পথ পেরিয়ে একটা পর্যায়ে এসেছিলেন তিনি। এমন সংগ্রামী সুমনের আত্মহত্যা করার প্রশ্নই ওঠে না। সুমন খুব সচেতন ছিলেন। বাসা থেকে তিনি সব সময় মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতেন। কিন্তু আজ (গতকাল) তাঁর সঙ্গে মোটরসাইকেল ছিল না। তাঁর মতো একজন সচেতন মানুষের সামনে এত বড় ট্রেন আসবে আর তিনি ট্রেনে কাটা পড়বেন, এটা হতেই পারে না।
ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির এক নেতা জানান, কয়দিন আগে মুন্সীগঞ্জে শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যা করা হয়েছে, এর আগে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাইকে খুন করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী কোনো চক্র আবার জেগে উঠছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুমনের ঘটনাটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কারা, কিভাবে এবং কেন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। 
নিহতের শ্যালক সারোয়ার হোসেন বলেন, সুমন ওখানে (খিলগাঁও) যাওয়ার পেছনে নিশ্চয় কারণ আছে। তাঁকে বাসা থেকে ডেকে কৌশলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তিনি যে আত্মহত্যা করবেন সে রকম কোনো কারণও দেখছি না। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দেওয়ায় সুমনকে হত্যা করা হয়েছে। সুমন ব্যাংকে চাকরি করলেও চার মাস আগে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি আরো বলেন, যেখানে তাঁর লাশ পাওয়া গিয়েছিল, বাসা থেকে হেঁটে সেখানে যেতে ৮-১০ মিনিট লাগে। ঘটনাটি খুবই রহস্যজনক। আশা করি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করবে।
শাহজাহানপুর থানার ওসি আব্দুল মামুদ জানান, তারা গিয়ে ঘটনাস্থলে খণ্ডিত লাশটি দেখেন। তাঁর মাথা থেকে দেহ বিচ্ছিন্ন ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, কজন বলেছেন, ওই ব্যক্তি রেললাইন পার হওয়ার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। এরপরেই কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়।
ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি একটি দুর্ঘটনা। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক বলেন, খিলগাঁও বাগিচা এলাকায় হিকমাহ আই হসপিটালের পাশে সুমন জাহিদের লাশ পাওয়া যায়। তিনি ট্রেনের নিচে পড়েন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আমরা সকাল ১০টার দিকে খবর পেয়ে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠাই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তার পরও বিষয়টি জোরোলোভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়জন দোকানি কালের কণ্ঠকে জানান, কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেনের নিচে পড়ে তিনি মারা যান। তা ছাড়া ট্রেন আসার সময় রেললাইনের আশপাশে কোনো লোকও থাকে না। ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর তাঁর দ্বিখণ্ডিত লাশ দেখতে পাওয়া যায়। এ সময় মিনিট দশেকের মতো ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার এসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, খবর পেয়ে সকাল পৌনে ১০টায় খিলগাঁও বাগিচা মসজিদসংলগ্ন রেললাইন থেকে সুমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। রেললাইন ঘেঁষেই সুমন জাহিদের লাশ পড়ে ছিল। আমরা ধারণা করছি, ট্রেনের চাকা তাঁর গলার ওপর দিয়ে গেছে। তবে কোন ট্রেন তা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ : এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল তিন শিশু। এদের একজনের নাম নার্গিস। সে খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঘটনাস্থল বাগিচা এলাকার রেললাইনের পাশে একটি টংঘর চায়ের দোকান। গতকাল সকাল ৯টার দিকে সুমন জাহিদ ওই চায়ের দোকানে বসে চা খান। এ সময় দোকানের সামনে খেলারত তিন শিশুর সঙ্গে তিনি কথাও বলেন। প্রায় ১০ মিনিট তাদের সঙ্গে গল্প করেন তিনি। এরই মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শুনতে ছুটে যান রেললাইনে। লোহার দণ্ডের ওপর গলা রেখে আড়াআড়ি শুয়ে পড়েন। দৃশ্যটি দেখে নার্গিসসহ তিন শিশু ছুটে যায়। নার্গিস তার পা ধরে টেনে আনার চেষ্টা করে। নার্গিস বলে, ‘আপনি সইরা যান। ট্রেন আইতাছে। তখন সুমন জাহিদ তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। নার্গিস রেললাইন থেকে নিচে চলে যায়। এ সময় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুতগতিতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। মুহূর্তেই রেললাইনের বাইরে সুমন জাহিদের মাথাটি ছিটকে পড়ে। মাথাবিহীন ধড় পড়ে থাকে রেললাইনের ভেতরে।’
ঢাকা রেলপথ থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক বলেন, ঘটনার পর আশপাশের লোকজনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। টংঘরের চায়ের দোকানি বলেছেন, ওই ব্যক্তি নিজেই রেললাইনে শুয়ে পড়েন। এর আগেও ওই ব্যক্তি গত চার দিন ধরে সকালে ওই দোকানে চা খেয়েছেন। তাঁকে খুব চুপচাপ থাকতে দেখা যেত।
সুমন জাহিদ অনেক সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন। একসময় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনে প্রশাসনিক পদে চাকরি করতেন। পরে ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। চার মাস আগে ফারমার্স ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা টাকার জন্য তাঁর ওপর চাপ দিচ্ছিলেন। তাঁরই পরিচিতজনরা ফারমার্স ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন। এ কারণে ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পর পরিচিতরা টাকার জন্য তাঁকে চাপ দিতে থাকেন। এ কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
ময়নাতদন্ত : এদিকে সুমন জাহিদের ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশের পিঠে, মাথায়, মুখের সামনে, গালে ও নাকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে মনে হচ্ছে শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়েছে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে। সুমনকে অজ্ঞান করে রেললাইনের ওপর রেখে গেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল মাহমুদ বলেন, হতে পারে। তিনি বলেন, ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে করে এরপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তখন নিশ্চিত হওয়া যাবে কিভাবে মারা গেছেন।
সুমন জাহিদের মৃত্যুতে শোক : ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি সুমনের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এটি একটি নিছক দুর্ঘটনা, না পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। ১৯৭১ সালে তাঁর মা সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। পরে ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার করা হয় তার মৃতদেহ। নিউ সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে মাকে যখন ধরে নিয়ে যায়, ছোট্ট সুমন তখন বাড়ির ছাদে খেলছিল। সুমনের অকাল মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী ও শিশুসন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছে নির্মূল কমিটি।
নির্মূল কমিটির পক্ষে বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি শামসুল হুদা, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপক অজয় রায়, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সাংবাদিক কামাল লোহানী, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক অনুপম সেন, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুন নবী, অধ্যাপক পান্না কায়সার, স্থপতি রবিউল হুসাইন, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রমুখ।
কালের কণ্ঠ’র ফেনী প্রতিনিধি জানান, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের সন্তান সুমন জাহিদের রহস্যজনক মৃত্যুতে ফেনীতে তাঁর নানা বাড়িসহ গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ফেনী শহরের শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক (নাজির রোড) এলাকার মাস্টার বাড়িতে সুমনের নানার বাড়ি। সুমনের মামাতো ভাই মিজানুর রহমান শাহীন জানান, খুবই মাটির মানুষ ছিলেন সুমন ভাই। তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুতে সবাই হতবাক ও শোকাহত। তিনি জানান, মাঝেমধ্যে ফেনীতে আসতেন তিনি। নানা সংগঠনের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ফেনীতে একাধিক সামাজিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সুমনের। তিনি নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফেনীতে আসতেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড ফেনী শাখার সভাপতি রুপক হাজারী এ ঘটনাকে রহস্যজনক বলে অভিহিত করেন এবং প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে এ রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান। 

Saturday, April 14, 2018

শুভ নববর্ষ ১৪২৫

শুভ নববর্ষ ১৪২৫ গতকাল আমার ৬৫তম জন্ম দিনে অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী বন্ধু ভাই ভ্রাতা ভগ্নি ফেসবুক টুইটর ইয়াহু ওয়ার্ডপ্রেস লিংকড ইনষ্টগ্রাম গুগল ফ্লিকারে শুভেচ্ছা দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ প্রদান করা সম্ভব ছিল না। সবাই ভালো থাকুন, সবাই সুস্থ্য থাকুন, সুন্দর থাকুন, সকলের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটুক আত্মীয় পরিজন বন্ধু বান্ধব মা বাবাকে নইয়ে নিশ্চিন্তে নিরুদ্বেগে শান্তিতে সুখে সমৃদ্ধিতে। সকলের জীবনের সকল কষ্ট বেদনা হতাশা ব্যর্থতার গ্লানি মুছে যাক বৈশাখী দক্ষিণা সমীরনের দমকা হাওয়ায়। ভরে উঠুক বাঙ্গালীর জীবনের প্রতিটি কানায় কানায় । হৃদয়ের রন্দ্রে রন্দ্রে বেজে উঠুক সাম্যের গান-আল ক্বোর'আন, গীতা , বাইবেল, ত্রিপিটক ও বিধাতার প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার সমীহ শ্রদ্ধা ভক্তি একান্ত আত্মসমর্পণ। সুখে থাকুক গোপালগঞ্জের হতভাগা চির অভাগা চির বঞ্চিত লাঞ্ছিত শেখ লুতফর রহমানের সোনার ছেলে শেখ মুজিবের ১৬ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষ; যে একটি মানুষ স্ত্রীপুত্র কন্যা মা বাবা ভাই বোন থেকে বঞ্ছিত হয়ে সারাটি জীবন এই বাঙ্গালীর জন্য দেশ থেকে দেশান্তরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া কখনো পায়ে হেটে কখনো নৌকায় আবার কখনো ভাংগা গাড়িতে চড়ে হতভাগা হতদরিদ্র্য চির লাঞ্ছিত বঞ্চিত অবহেলিত শোষিত দুখি বাঙ্গালীর খোজ নিতে গিয়ে নিজের জীবনের সকল সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছিলেন বদ্ধ জেলখানায় বসেও যার বাঙ্গালীর চিন্তায় নিদ্রায় যেতে পারতেন না, সে সোনার দেশের সোনার ছেলে গোপালগঞ্জের শেখ মুজিবের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উদ্গত ভালোবাসায় সিক্ত বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধশালী দেশ হয়ে উঠুক। বাঙ্গালী থাক মাছে ভাতে দুধে আমে মিষ্টিতে অনাদিকাল বৈশাখের ১ম দিনের প্রথম বৃষ্টির পবিত্র জল্ধারায় ধুয়ে মুছে নিষ্কলঙ্ক নিস্পাপ হয়ে যাক বাঙ্গালী জাতি।

SUPPORT AWAMI LEAGUE, VOTE NOUKA ONCE AGAIN

Thursday, April 12, 2018

মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় সমীপে মুক্তির খোলা চিঠিঃ


মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় সমীপে মুক্তির খোলা চিঠিঃ

মহোদয়,
যথাযোগ্য মর্যাদা ও সন্মান পুরঃসর বিনীত নিবেদন এই যে, আমি জন্মসূত্রে একজন বাংলাদেশি জাতীয় কন্ঠশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ইউনিক গ্রুপের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নূর আলীর ব্যক্তিগত সচিব থাকাকালীণ ২০০২ সালে জামাত বি এন পি জোট সরকারের অবৈধ আস্তানা "হাওয়া ভবনের" ভূয়া মামলা ও নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হই এবং মালদ্বীপে এসে একটি স্কুলে শিক্ষকতা শূরু করি।
আমার চির স্বভাবজনিত দুর্বিনীত প্রতিবাদী মানসিকতার কথা স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান সরকারের বহু নেতা/মন্ত্রীগণ অবহিত রয়েছেন। আওয়ামী লীগ অফিসে বঙ্গবন্ধুর গানের মুক্তি নামেই সর্বজনবিদিত।
আওয়ামী রক্ত তাই প্রবাসে এসেও নীরব থাকতে পারিনি; যে দেশে প্রবাসীদের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সে দেশে আমি মুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম মালদ্বীপ আওয়ামী লীগ।
মালদ্বীপস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ( সাবেক হাই কমিশন) এর সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবে বহু লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।
এমন কি এতদবিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জেনারেল আবেদীন, সাবেক মন্ত্রী কর্নেল ফারুক, আব্দুস সোবহান গোলাপ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমান, জুনায়েদ আহমেদ পলক ও ডঃ দীপুমনিও অবহিত আছেন।
মালদ্বীপ আওয়ামী লীগের অনেক অনুষ্ঠানেই বহু মন্ত্রী ও মান্যবর সাবেক হাই কমিশনার রিয়ার এডমিরাল আওয়াল সাহেবও যোগদান করেছিলেন । ভিডিও ও ছবি প্রমানবহন করে (ছবি সংযুক্ত )

মালদ্বীপ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২০১৪ সালে ইস্কান্দার স্কুলে জাতীয় শোক দিবস পালনের আয়োজন করেছিলাম । সে অনুষ্ঠান করতে দেয়নি হেড অফ দি চ্যাঞ্চেরী হারুন অর রশিদ।

আমি মালদ্বীপের মহামান্য প্রেসিডেন্ট ডঃ ইয়ামীন মাওমুনের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সামনেই ছিলাম।

হঠাত একটি ফোন এলোঃ
*******************
ঃহ্যালো আমি হেড অফ দি চ্যাঞ্ছেরী হারুন অর রশিদ বলছি;
ঃকে মুক্তি সাহেব বলছেন?
ঃজ্বি
ঃশুনেছি আপনি ১৫ই আগষ্ট পালন করছেন আপনার ইস্কান্দার স্কুলে?
ঃজ্বি আমার সব অনুষ্ঠান তো ইস্কান্দার স্কুলেই হয়ে থাকে।
ঃআপনি এ অনুষ্ঠান করতে পারবেন না; ঐ দিন হাই কমিশন থেকে অনুষ্ঠান করা হবে সূতরাং আপনার অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে;
ঃআমি এ মুহূর্তে কথা বলতে পারছি না; আমি প্রেসিডেন্টের সামনে কাজেই পড়ে কথা বলছি;
ঃআপনি বুঝতে পারছেন তো যে হাই কমিশন আপনাকে কল করেছে?
******************
মালদ্বীপের রাজধানী মালে ইস্কান্দার স্কুলে আমি মুক্তি যে হলটিতে পররাষ্ট্র প্রতি মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রবাসী কল্যান ও জনশক্তিমন্ত্রী ইঞ্জিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেরকে সংবর্ধনা দিয়েছি, সে হলেই আয়োজন করেছিলাম জাতীয় শোক দিবস ২০১৪।

সে অনুষ্ঠানের অপরাধেই আমার মালদ্বীপের সোনালী দিনগুলো ১৫ই আগস্টের চেয়েও ভয়াবহ করে তুলেছিল এই হারুন অর রশিদ, হেড অফ দি চ্যাঞ্ছেরী এবং সাবেক হাই কমিশনার রিয়ার এডমিরাল আওয়াল।
********
মালদ্বীপে আমার হাতে গড়া আওয়ামী লীগের ছেলেদের ভয় ভীতি দেখিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে পঙ্গু করে দেয়া হল। তারপরেও হারুন অর রশিদ সাহেবের খায়েশ মিটেনি। সে মালে অবস্থানরত তার পোষা দালাল আদম ব্যবসায়ী, গাঞ্জা ব্যবসায়ী, ডলার ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ নিয়ে চলে এবং সীমাহীন দুর্নীতি লুটপাট করে বেড়ায়। এখানে অতিরঞ্জিত কিছুই লিখছি না। প্রমান সহই দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেরণ করেছি আমি তদন্ত চাই। অতি সম্প্রতি সে ঐ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। আমাকে টেলিফোনে মারধর করার হুমকি দিয়েছে। বিষয়টি মালদ্বীপ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

মালদ্বীপ দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়ে গেল। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে বাংলাদেশ দূতাবাস গত ২১শে ফেব্রুয়ারি এবং স্বাধীনতা দিবসে একজন ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়া মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় কন্ঠশিল্পী ও মালদ্বীপ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মালদ্বীপ সরকারের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিক্ষক (আমি নিজে ), একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মালদ্বীপে কর্মরত ৩৩ বছরের সিনিয়র ফিজিক্সের শিক্ষক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মীর সাইফুল ইসলাম এবং আর একজন ২৫ বছর যাবত মালদ্বীপে শিক্ষকতায়রত গজল সঙ্গীত শিল্পী মালদ্বীপের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সর্বজনবিদিত শিক্ষক মোঃ শফিকুল ইসলাম।

এই তিন জন শিক্ষকের কাউকেই মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মালদ্বীপস্থ দূতাবাস নিমন্ত্রণ করেন নি। বিষয়টি মালদ্বীপের মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্ট হাউসের কর্মকর্তাদেরও নজরে এসেছে। এ দেশে বাংলাদেশী এই তিনজন শিক্ষকই অত্যন্ত দক্ষতার কারনে এবং বিশেষ করে শফিক ও আমি গানের কারনে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কোন মন্ত্রী, ধনিক ব্যবসায়ী, বর্ণাঢ্য বণিক শিল্পী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কেউ নেই যে আমাদের এই তিনজনকে না চিনেন বা না জানেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে স্বাধীনতা দিবসে আমন্ত্রণ না করার হেতু একটাই হতে পারে যে দেশ আজো স্বাধীন হয়নি অথবা এই দূতাবাস পাকিস্তানের অথবা এই দূতাবাসে মহান স্বাধীনতার স্বপক্ষের কোন কর্মকর্তা কর্মচারী নেই।
মহান স্বাধীনতা দিবসে কেন আমাদের দূতাবাস নিমন্ত্রণ করেনি? আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিভাগীয় মাননীয় মন্ত্রী হিসেবে আপনাকে অবহিত করলাম।
আমরা জাতীয় সম্পদ। আমাদেরকে জাতীয়ভাবেই অপমান করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। কারন জানতে চাই।

মহানুভব, পররাষ্ট্রনীতি ও কুটনৈতিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাত আপনার সমগ্র জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা আজ পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশাসনিক জটিলতা সমস্যাদি সমাধান ও বিদেশের সাথে পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপনে আপনার সততা শ্রম ও সফলতার সূত্র ধরেই আজ সুবিচারের প্রত্যাশায় আপনাকে অবহিত করলাম। যদি বাংলাদেশ সরকার মনে করে আমি বাঙ্গালী নই, বাংলাদেশী নই-আমার পাসপোর্ট বাংলাদেশ সরকার জব্ধ করতে পারে, আমার কোন আপত্তি নাই। কিন্ত এ অপমানের বোঝা নিয়ে বাঙ্গালী হিসেবে আর মালদ্বীপে পরিচয় দিতে চাইনা। প্রয়োজনে পাসপোর্ট পুড়িয়ে শরণার্থী হয়ে যাবো যেমনটি হয়েছিলাম ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নিয়ে।
ভালো থাকুক দেশের মানুষ ভালো থাকুক শেখ মুজিবের নিরস্পেষিত নির্যাতিত লাঞ্ছিত বঞ্চিত অবহেলিত চির দুখি চির সংগ্রামী বাঙ্গালী জাতি।
আল্লাহ আপনার ভালো করুন;
দেশ আরো এগিয়ে যাক, আরো উন্নয়ন ঘটূক, উত্তরোত্তর বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ খ্যাত স্বীকৃতিকে ডিঙ্গিয়ে উন্নত দেশের তালিকায় লিপিবদ্ধ হোক;

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
আপনার একান্ত ভক্ত অনুরাগী
মোকতেল হোসেন মুক্তি
বীর মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় কন্ঠশিল্পী
সিনিয়র সঙ্গীত শিক্ষক
ইস্কান্দার স্কুল মালে, মালদ্বীপ

Monday, March 5, 2018

অশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা ও ভাতা প্রসঙ্গে এত জ্বলন কেন? মোকতেল হোসেন মুক্তি

অশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা ও ভাতা প্রসঙ্গে এত জ্বলন কেন? মোকতেল হোসেন মুক্তি
“সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালী করে মানুষ করনি”-

former secretary Nazrul Islam khan N I Khan নামেই বেশী পরিচিত। সাবেক এই সচিব মহান মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় ৪ নেতাদের নিয়ে অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখা লিখেছেন। মনে প্রাণেই মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির একজন তুখোড় লেখক সমালোচক এবং গবেষক । তিনি উচ্চ শিক্ষিত বিধায় তাঁকে নিয়ে কোন খারাপ মন্তব্য করা সমীচীন নয়। কিন্তু একটি বিষয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না যে তিনি কেন হঠাত করে মূর্খ গরীব অসহায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের একান্ত প্রাপ্য জাতীয় মর্যাদা ও সন্মানাদি প্রসঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বিরুপ কঠোর সমালোচনামূলক বিতর্কের সৃষ্টি করলেন? একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও আমার সন্তান আমি বিদেশে নিজের কষ্টার্জিত অর্থেই লেখা পড়া করিয়েছি। নিজে যা'পারিনি তা' সন্তানদের পুরন করার এই যে মহান প্রত্যয় ও প্রত্যাশা তা' বাস্তবায়ন করা অতি হত দরিদ্র্য নিভৃত পল্লীর অখ্যাত অজ্ঞাত অশিক্ষিত একজন বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আদৌ সম্ভব নয়। ১। মাদারীপুর কালকিনি উপজেলার কমান্ডার মুক্তিযুদ্ধকালীন আমার কমান্ডার New Zealand প্রবাসী Hanif Mahmud নিজেও উচ্চ শিক্ষিত এবং তাঁর সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ২। মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী সেক্টর কমান্ডারগণ/ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক/ইউনিক গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূর আলী/নৌ পরিবহন মন্ত্রী মোঃ শাহজাহান খানসহ আরো অগনিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা অথবা তাদের সন্তানেরা কি অশিক্ষিত? অন্যান্য বিত্তশালী উচ্চ শিক্ষিত বর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী/শিল্পী/সাহিত্যিকগীতিকার/সুরকার/সচিব/কবি/লেখক/ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ারদের কথা না হয় উল্লেখ নাই করলাম। যাদের আর্থিক সঙ্গতি রয়েছে তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে এই বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধার কোটা প্রয়োজন নেই। তাই তাঁরা এ সব নিয়ে কখনো মাথায় ঘামাননি বা বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে কোন মিডিয়া বা পত্র/পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হয়নি। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা এই হত দরিদ্র্য অজো পাড়া গায়ে অবহেলা অবজ্ঞা দীনহীন মানবেতর জীবন যাপন করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়নের লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা/কোটা ইত্যাদিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যথা গ্যাস বিল পানি বিল বিদ্যুৎ বিল সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স-আয়কর কিছুটা কমিয়ে সহজতর করার চেষ্টা করেছেন। যদিও এরই মধ্যে বিগত জামাত বি এন পি সরকারের অশুভ কর্ম পরিধি মুক্তিযোদ্ধার তালিকাকে কলুষিত ও কলঙ্কিত করেছে। তালিকায় নাম এসেছে ৪ বছরের দুধের শিশুর। বিধায় আসল মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই নাম আজো তালিকাভুক্ত হয়নি। যে সমস্যা নিয়ে আমরা অনেকেই হা হুতাশ এবং বর্তমান সরকারের মন্ত্রী নেতা ও কমান্ডারদের কঠোর সমালোচনা করে যাচ্ছি। অন্যদিকে অমুক্তিযোদ্ধা হাতিয়ে নিচ্ছে শেখ হাসিনার দেয়া সকল সুযোগ সুবিধাদি। "সকলের জন্য ধান, সকলের জন্য চাল, সকলের জন্য পানি, সকলের জন্য ভূমি, শিক্ষা, সকলের জন্য অন্ন বস্ত্র বাসস্থান, সকলের জন্য আর্থ সামাজিক উন্নয়নের সুসমবন্টন, সকলের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল, সকলের জন্য একটি সুখি সাচ্ছন্দ জীবন ব্যবস্থার জন্যই জাতিরজনকের আজীবন সংগ্রাম এই মহান "স্বাধীনতা"। সাড়ে সাত কোটি থেকে আজ আমরা ১৬ কোটি ৩৫ লক্ষে পৌছে গিয়েও সমাধান করা সম্ভব হয়নি হতভাগা মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্যা। এর মূল কারন ১৯৭৫ সালে জাতিরজনক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সফল সংগঠক জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং পাকিস্তান আই এস আই'র পা'চাটা কুকুর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে হারিয়ে গিয়েছে আসল মুক্তিযোদ্ধারা এবং দেশপ্রেমিক সোনার মানুষগুলো। "৭৫ পরবর্তী এমনও পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে যে ভয়ে অনেকেই স্বীকার করেনি যে আমি মুক্তিযোদ্ধা" বা আওয়ামী লীগ সমর্থনকারী । কি ভয়াবহ ছিল বাঙ্গালী জাতির ২১টি বছর! ভাবতে গেলে গা'শিউরে ওঠে! লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে স্বাধীনতা বিরোধী আল বদর আল শামস আল-রাজাকারের কোন সন্তান অশিক্ষিত নয় এবং দারিদ্র্যসীমার নীচে জীবন প্রবাহ অতিবাহিত করে না। ভাগ্নে সজীব ওয়াজেদ জয় " একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ' এর একটি সেমিনারে উল্লেখ করেছিলেন " মহান স্বাধীনতায় বাঙ্গালী জাতি বিজয় অর্জন করলেও স্বাধীনতার সুফল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির ঘরে পৌছায় নি" কথাগুলো একটি ছোট মানুষের হলেও বিশাল এবং ব্যাপক অর্থে মহা দর্শনের চেয়েও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ছিল সজীব ওয়াজেদ জয়ের সে বক্তব্য। অতি সম্প্রতি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জনৈক মুনতাসীর মামুন স্যার এবং শাহরিয়ার কবীর (যিনি জীবনে তাঁর কোন লেখায় বঙ্গবন্ধুকে জাতিরজনক বলে স্বীকার করেন নি বা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোন লেখা প্রবন্ধ গল্প কাহিনী কখনো লিখেন নি কিন্তু তিনি রাজাকারের ফাসি চেয়েছেন) এই মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন এবং পরবর্তীতে নেত্রীর পরোক্ষ ধমক অর্থাৎ সান্টিং খেয়েই দালাল নির্মূল কমিটির দালালগণ থেমে গিয়েছিলেন। মুনতাসীর মামুন সাহেব আবার আওয়ামী লীগ সরকারের পয়সায় ইতোমধ্যে পবিত্র হজ্বব্রতটিও বীনা পয়সায় সেরে নিয়েছেন। যাক সে কথা লিখছিলাম। একটি বিষয় আমি ৭১ থেকে এ পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লক্ষ করে এসেছি এবং হিসাব মিলিয়েও দেখেছি যে সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান স্যারের কথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা খুজে পেলেও এই ভাতা ও কোটার বিরুদ্ধে তাঁর মত বিচক্ষন ব্যক্তি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্ব উচ্চ ডিগ্রিধারী একজন পণ্ডিত ব্যক্তির বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি সমর্থকের কলামে/ভাষায়/লেখায়/বলায়/ তর্কে /বিতর্কে বিরোধীতা কেমন যেনো বেমানান এবং অশালীনতার মতই গা'জ্বালাময় বক্তব্য। আমি তাঁকে চিনি এবং জানি। তিনি মনে প্রাণেই জাতিরজনকের একান্ত ভক্ত অনুসারী । কিন্তু এই হতভাগা দীনহীন অশিক্ষিত হত দরিদ্র্য অজো পাড়া গায়ের সর্ব কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের "অশিক্ষিত বা মূর্খ" শব্দটি ব্যবহার করে সর্বনাশ করে দিলেন! আমি হতবাক নজরুল স্যার! আপনার মত ব্যক্তির মূখে মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীরের মত বস্তাপচা সস্তা হাত তালির প্রত্যাশায় এহেন বক্তব্য নিদারুণ বেদনাদায়ক এবং অসহনীয়। আমার গ্রামে আব্দুর রহিম সরদার নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা। যার সন্তান এস এস সি পরীক্ষা দেবার ফি না দিতে পারার কারনে ঘরে বসে কাদতে ছিলেন। তারপরে যেভাবেই হোক অন্য কেউ ব্যবস্থা করেছিল। আজ যদি এই হত দরিদ্র্য আব্দুর রহিম সরদারের অর্থ থাকত তাহলে ইউনুক গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূর আলি স্যারের মতই এই রহিমের ছেলেও আমেরিকান ইন্টারন্যাসনাল স্কুলে ইংলিশ মিডিয়ামে নিউ ইয়র্কে লেখা পড়া করত এবং মাসের ঐ ১০ হাজার টাকা ভিক্ষা এবং ছেলেকে ভর্তি ফি না দিতে পারার যন্ত্রণায় কাতরাতে হতনা। কাজেই এই হত দরিদ্র্য রহিমের ছেলে যেভাবেই হোক পাস করে একটি চাকুরী নিতে যাবে। ১০০ মার্কের মধ্যে যদি সে ৮০ থেকে ৯০ ও প্রাপ্ত হয় তার চাকুরী হবে না। কেন জানেন? কারন একটি সরকারী চাকুরী নিতে গোটা দেশে এখন হাইব্রীড কাউয়া ফার্মের মূরগীর দালালদের নিকট প্রথমে দৌড়াতে হবে। তারপরে চুক্তি হবে দালালের সাথে। কত লাখ দিতে পারবেন? না না তা' হবে না, কারন মন্ত্রী সাহেবকেই দিতে হবে ৫ লাখ। তারপরে ওমক নেতাকে দিতে হবে এবং এর মধ্য থেকেই আমার % রাখতে হবে। এখন আসুন আসল কথায় আমার গ্রাম দক্ষিন আকাল বরিশ ঐ যে হতভাগা বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম সরদারের ছেলে গল্প বলছিলাম-সে আব্দুর রহিম সরদার ওর বাপ দাদা ১৪ গুষ্ঠির সকল ঘর বাড়ী সহায় সম্বল কম্বল বিক্রয় করলেও ২ লাখ টাকার বেশী যোগার করতে পারবে না। আমার আত্মীয় আমার সহপাঠী, সহযোদ্ধা বন্ধু, আমি তার একান্তজন হিসেবে সবই জানি। সে আমারই এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছিল। তাহলে নজরুল স্যার আপনি যে বললেন সকল % কেটে মাত্র ৫% কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সীমিত রাখতে, বাকীটা কি ঐ সকল আল বদর আল শামস আল রাজাকারের সন্তানের জন্য রাখতে বলছেন? নাকি আপনার ছেলে মেয়ে অথবা মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীরের ছেলে মেয়েদের জন্য রাখতে বলছেন? তবে স্যার একটা কথা জেনে রাখবেন-মনে রাখবেন " জাতিরজনকের ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ও ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণায় উল্লেখ করা উচিত ছিল যে অশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করতে পারবে না - শুধু আপনাদের মত মহা জ্ঞানপাপী পন্ডিত বর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী সুদখোড় ইউনুসের মত ধনকুবের লুটেরা, রাজাকার মুসা বীন শমসেরের (লুনা মুসার) মত গোটা বাংলাদেশের খেতে খামারে ব্রিটিশ সরকারের গাঁরা ম্যাকনেট চুরি করে বিক্রয়কারী) মুনতাসীর মামুনের মত দালাল এবং শাহরিয়ার কবীরের মত সুবিধাভোগি চাটুকর তোষামোদকারীরাই মুক্তিযুদ্ধ করতে পারবে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক জেলে তাতী কামার কুমার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কবি শিল্পী সাহিত্যিক লেখক নৌকার মাঝি ইঞ্জিনের ড্রাইভার অথবা রিকশা/ভ্যানগাড়ী চালক/বাসের ড্রাইভার/হেল্পার/ঠিকাদার কারো কথাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেননি। সেহেতু আপনাদের এহেন অবান্তর অহেতুক কোটার বিরোধী তথা হত দরিদ্র্য দীনহীন মজদুর অজো পাড়া গায়ের নিভৃত পলীতে রাত দিন আপনাদের মূখের অন্ন ফলানোর কাজে ব্যস্ত বয়োবৃদ্ধ অশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধের "অশিক্ষিত" বলে সম্বোধন করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মহা নায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতিরজনকের বিদেহী আত্মাকে কষ্ট দেবার চেষ্টা থেকে বিরত হোন। আপনি ভালো থাকুন। সুন্দর থাকুন। আমরাত অশিক্ষিতই; সে দোষ ত আমাদের না স্যার? সে দোষ পশ্চিমা শোষক হায়েনা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লিয়াকত আলী খান আইউব খান টিক্কা খান, মোনায়েম খানদের। “সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙ্গালী করে মানুষ করনি।”- কবির এ মর্মবেদনা অনেক পুরোনো।সেদিনের কবির চেতনায় আগুন ধরেছিল বঙ্গ সন্তানদের চেহারা দেখে। তাই বড় আফসোস করে কবি তার বেদনা দগ্ধ চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন কাব্যিক ছন্দে।কিন্তু আজ অনেক চড়াই উৎরাই ঘাত প্রতিঘাত আর উস্থান-পতনের মাধ্যমে স্বাধীনতার এতো বছর পরেও বাঙ্গালীর জাতির পিতা নিয়ে আমরা নষ্ট খেলা,ইতিহাস নিয়ে টানাটানি এবং অপবাদ নিয়ে মেতে আছি। আমরা আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে, সংশয় এবং মানা না মানার মধ্যে দিয়ে যে নষ্ট খেলায় মেতে আছি তা শুধু আমাদের জন্য অপমান জনক না বরং তা আমাদের বিশ্বের মানচিত্রে অতি নগ্ন হিসাবেই পরিচিত লাভ করাতে দ্বিগুন সাহায্য করে। ঠিক তেমনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে এবং ভাতা ও কোটা নিয়েও আপনারা আজ জাতিরজনক নেই বলেই টানা হেচড়া করে সন্মানের বদলে অসন্মান করছেন। তাহলে আমাদের ঢাকা ষ্টেডিয়ামে ডেকে কেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে অস্ত্র জমাদানের প্রাক্কালে জীবন প্রদ্বীপ নিভিয়ে দিলেন না?

Monday, February 26, 2018

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্ম নেয়া প্রথম বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা মহিয়সী নারী


লীলা রায় ও দীপালী সঙ্ঘ
চট্টগ্রামের, পটিয়ার ধলঘাটে বীরকণ্যা প্রীতিলতা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ২০০৫ সনের ২২ শে ফেব্রুয়ারী প্রতিষ্ঠিত প্রীতিলতার আবক্ষ মূর্তির স্থিরচিত্র।
প্রীতিলতা তখন সবে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা তখন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন। এর মধ্যে ১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস এর মোড়ে সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করে। এ ছিনতাইয়ের প্রায় দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে যুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় রেলওয়ে ডাকাতি মামলা। এই ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই মামলার ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে অনেক কিছুই জানতে পারেন তিনি। ঊষাদির দেয়া “ঝাঁসীর রাণী” বইটি পড়ার সময় ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাইয়ের জীবনী তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। ১৯২৪ সালে বেঙ্গল অর্ডিনান্স নামে এক জরুরি আইনে বিপ্লবীদের বিনাবিচারে আটক করা শুরু হয়। চট্টগ্রামের বিপ্লবীদলের অনেক নেতা ও সদস্য এই আইনে আটক হয়েছিল। তখন বিপ্লবী সংগঠনের ছাত্র আর যুবকদেরকে অস্ত্রশস্ত্র, সাইকেল ও বইপত্র গোপনে রাখার ব্যবস্থা করতে হত। সরকার বিপ্লবীদের প্রকাশনা সমুহ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। প্রীতিলতার নিকট-আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। তিনি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই প্রীতিলতার কাছে রাখেন। তখন তিনি দশম শ্রেনীর ছাত্রী। লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি পড়েন “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল”।এই সমস্ত গ্রন্থ প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। প্রীতিলতা দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করার গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত বিপ্লবীদলে মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কোন মেয়েদের সাথে মেলামেশা করাও বিপ্লবীদের জন্য নিষেধ ছিলো।
আত্মাহুতির স্থানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ২০১২ সালের ২ অক্টোবর প্রীতিলতার ব্রোঞ্জমূর্তি উন্মোচিত হয়।

ঢাকায় যখন প্রীতিলতা পড়তে যান তখন “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংঘঠন ছিল। এই দলটি প্পকাশ্যে লাঠিখেলা, কুস্তি, ডনবৈঠক, মুষ্টিযুদ্ধশিক্ষা ইত্যাদির জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ক্লাব তৈরী করেছিল। ঢাকায় শ্রীসংঘের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। লীলা নাগ (বিয়ের পর লীলা রায়) এর নেতৃত্বে এই সংগঠনটি নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য কাজ করত। গোপনে তাঁরা মেয়েদের বিপ্লবী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ ও করত। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে লীলা রায়ের সাথে প্রীতিলতার পরিচয় হয়েছিল। তাঁদের অনুপ্রেরণায় দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন “আই এ পড়ার জন্য ঢাকায় দু’বছর থাকার সময় আমি নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসাবে নিজেকে গডে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি”। ১৯২৯ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে সূর্য সেন ও তাঁর সহযোগীরা চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের জেলা সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন, যুব সম্মেলন ইত্যাদি আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। নারী সম্মেলন করবার কোন পরিকল্পনা তখনও ছিলো না কিন্তু পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বিপুল উৎসাহের জন্যই সূর্য সেন নারী সম্মেলন আয়োজনের সম্মতি দেন। মহিলা কংগ্রেস নেত্রী লতিকা বোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রীতিলতা ঢাকা থেকে এবং তাঁর বন্ধু ও সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে এসে যোগদান করেন। তাঁদের দুজনের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল সূর্য সেনের অধীনে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলে যুক্ত হওয়ার কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাঁদের ফিরে যেতে হয়। ১৯৩০ সালের ১৯ এপ্রিল আই এ পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে আসেন প্রীতিলতা। আগের দিন রাতেই চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের দীর্ঘ পরিকল্পিত আক্রমণে ধ্বংস হয় অস্ত্রাগার, পুলিশ লাইন, টেলিফোন অফিস এবং রেললাইন। এটি “চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ” নামে পরিচয় লাভ করে। চট্টগ্রামের মাটিতে বিপ্লবীদলের এই উত্থান সমগ্র বাংলার ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে। প্রীতিলতা লিখেছিলেন “পরীক্ষার পর ঐ বছরেরই ১৯শে এপ্রিল সকালে বাড়ি ফিরে আমি আগের রাতে চট্টগ্রামের বীর যোদ্ধাদের মহান কার্যকলাপের সংবাদ পাই। ঐ সব বীরদের জন্য আমার হৃদয় গভীর শ্রদ্ধায় আপ্লুত হল। কিন্তু ঐ বীরত্বপুর্ণ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে না পেরে এবং নাম শোনার পর থেকেই যে মাষ্টারদাকে গভীর শ্রদ্ধা করেছি তাঁকে একটু দেখতে না পেয়ে আমি বেদনাহত হলাম”।

ক্যাবলা'দা এবং গুণু পিসি


১৯৩০ সালে প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজে পড়তে আসেন। দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। যুব বিদ্রোহের পর তিনি মধ্য কলকাতায় বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়ের পিসির (গুণু পিসি) বাসায় আশ্রয় নেন। প্রীতিলতা ঐ বাসায় গিয়ে দাদার সঙ্গে প্রায় দেখা করতেন। পূর্ণেন্দু দস্তিদার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলে মনোরঞ্জন রায় (ক্যাবলা’দা নামে পরিচিত) নারী বিপ্লবীদের সংগঠিত করার কাজ করেন। যুব বিদ্রোহের পর পুলিশের হাতে গ্রেফতার এবং কারাগারে বন্দী নেতাদের সাথে আত্মগোপনে থাকা সূর্য সেনের সাথে বিভিন্ন ভাবে যোগাযোগ হত। তাঁরা তখন আরো হামলার পরিকল্পনা করছিল। সূর্য সেন প্রেসিডেন্সী কলেজের কেমিষ্ট্রির ছাত্র মনোরঞ্জন রায়কে গান-কটন এবং বোমা তৈরীর নির্দেশ দেন। তিনি এসব সংগ্রহ করে পলাতক বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা গুণু পিসির বাসায় রাখতেন। এ বাসায় বসে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, রেণুকা রায়, কমলা চ্যাটার্জী প্রমুখ বহু গোপন বৈঠক করেন এবং চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের পর মাষ্টারদার প্রেরিত ইস্তেহার সাইক্লোষ্টাইলে ছাপিয়ে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বিতরন করেন। মনোরঞ্জন রায়ের সাথে প্রীতিলতা এবং কল্পনা দত্তের পরিচয়ের পর তিনি বুঝতে পারেন যে এই মেয়ে দুটিই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপ্লবী কাজ করতে সক্ষম হবে। ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশের নজরদারী এড়িয়ে মনোরঞ্জন রায় কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম এসে সূর্য সেনের হাতে গান-কটন এবং বোমা তুলে দেন। এসময় তিনি জেলে থাকা বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ করে চিঠির আদান প্রদান এবং কলকাতা থেকে বিস্ফোরক বহন করে আনার বিপদ সম্পর্কে মাষ্টারদার দৃষ্টি আকর্ষন করেন। শহর আর গ্রামের যুবক বয়সীরা পুলিশের চোখে সবচেয়ে বড় সন্দেহভাজন। এ অবস্থায় সূর্য সেন নারী বিপ্লবীদের এসব কাজের দায়িত্ব দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কারণ তখনো গোয়েন্দা বিভাগ মেয়েদের সন্দেহ করতো না। মাষ্টারদার অনুমতি পাওয়ার পর নারীদের বিপ্লবের বিভিন্ন কাজে যুক্ত করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় প্রীতিলতার ভাস্কর্য।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সান্নিধ্যে প্রীতিলতা


চট্টগ্রামে সূর্য সেনের কাছে বোমা পৌঁছে দিয়ে কলকাতা ফেরত আসার একদিন পরেই ২৪ নভেম্বর মনোরঞ্জন রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।[৪৫] সে সময়ে টি জে ক্রেগ বাংলার ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ পদে নতুন দায়িত্ব নিয়ে চট্টগ্রাম সফরে আসেন। তাঁকে হত্যা করার জন্য মাষ্টার’দা রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে মনোনীত করলেন। পরিকল্পনা অনু্যায়ী ১৯৩০ সালের ২রা ডিসেম্বর চাঁদপুর রেলস্টেশনে তাঁরা রিভলবার নিয়ে আক্রমণ চালায় কিন্তু ভুল করে তাঁরা মিঃ ক্রেগের পরিবর্তে চাঁদপুরের এস ডি ও তারিণী মুখার্জিকে হত্যা করেন। সেদিনেই পুলিশ বোমা আর রিভলবার সহ রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে।[৪৬][৪৭] এই বোমাগু্লোই কলকাতা থেকে মনোরঞ্জন রায় চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন। তারিণী মুখার্জি হত্যা মামলার রায়ে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের মৃত্যুদন্ড এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে নির্বাসন দন্ড দেয়া হয়।[৪৮] ব্যয়বহুল বলে আলিপুর জেলের ফাঁসির সেলে মৃত্যু গ্রহণের প্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণের সাথে চট্টগ্রাম থেকে আত্নীয়দের মধ্যে কেউ দেখা করতে আসা সম্ভব ছিল না। এ খবর জানার পর মনোরঞ্জন রায় প্রীতিলতার কাছে লেখা এক চিঠিতে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে দেখা করার চেষ্টা করতে অনুরোধ করেন। মনোরঞ্জন রায়ের মা হিজলী জেলে ছেলের সাথে দেখা করতে গেলে গোপনে তিনি প্রীতিলতাকে লেখা চিঠিটা তাঁর হাতে দেন।[৪৯] গুনু পিসির উপদেশ অনুযায়ী প্রীতিলতা মৃত্যুপ্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে দেখা করার জন্য আলিপুর জেল কর্তৃপক্ষের কাছে “অমিতা দাস” ছদ্মনামে “কাজিন” পরিচয় দিয়ে দরখাস্ত করেন।[৫০] জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে তিনি প্রায় চল্লিশবার রামকৃষ্ণের সাথে দেখা করেন।[৫১] এ সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন “তাঁর (রামকৃষ্ণ বিশ্বাস) গাম্ভীর্যপুর্ণ চাউনি, খোলামেলা কথাবার্তা, নিঃশঙ্ক চিত্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, ঈশ্বরের প্রতি অচলা ভক্তি, শিশুসুলভ সারল্য, দরদীমন এবং প্রগাঢ় উপলব্দিবোধ আমার উপর গভীর রেখাপাত করল। আগের তুলনায় আমি দশগুন বেশি কর্মতৎপর হয়ে উঠলাম। আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত এই স্বদেশপ্রেমী যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ আমার জীবনের পরিপূর্ণতাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল।”[৫২] ১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসী হয়।[২৬] এই ঘটনা প্রীতিলতার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাঁর ভাষায় “রামকৃষ্ণদার ফাঁসীর পর বিপ্লবী কর্মকান্ডে সরাসরি যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক বেড়ে গেল।
দীর্ঘপ্রতীক্ষিত সময়ের অবসানঃ মাষ্টারদার সাথে সাক্ষাত


রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসীর পর আরো প্রায় নয় মাসের মতো প্রীতিলতাকে কলকাতায় থেকে যেতে হয় বি এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য।[৫২] পরীক্ষা দিয়ে প্রীতিলতা কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে বাড়ি এসে দেখেন তাঁর পিতার চাকরি নাই। সংসারের অর্থকষ্ট মেটানোর জন্য শিক্ষকতাকে তিনি পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন।[৫৩] চট্টগ্রামে বিশিষ্ট দানশীল ব্যাক্তিত্ব অপর্ণাচরণ দে’র সহযোগিতায় তখন নন্দনকাননে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমানে অপর্ণাচরণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়)। তিনি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন।[৫৪] স্কুলে যাওয়া, প্রাইভেট পড়ানো, মাকে সাংসারিক কাজে সাহায্য করে তাঁর দিনগুলো কাটছিল। কিন্তু তিনি লিখেছেন “১৯৩২ সালে বি এ পরীক্ষার পর মাষ্টারদার সাথে দেখা করবই এই প্রত্যয় নিয়ে বাড়ী ফিরে এলাম”।[৫২] বিপ্লবী মাষ্টারদা সূর্য সেনের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহের কথা তিনি কল্পনা দত্তকে বলেন। প্রীতিলতা কলকাতা থেকে আসার এক বছর আগে থেকেই কল্পনা দত্ত বেথুন কলেজ থেকে বদলী হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে বি এস সি ক্লাসে ভর্তি হন। সেজন্য প্রীতিলতার আগেই কল্পনা দত্তের সাথে মাষ্টারদার দেখা হয়।[৫৫] ১৯৩১ সালে এই গোপন সাক্ষাতের সময় আত্মগোপনে থাকা মাষ্টারদার সাথে ছিলেন বিপ্লবী নির্মল সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, শৈলেশ্বর চক্রবর্তী এবং কালীকিংকর দে।[৫১] মাষ্টারদা ঐ সাক্ষাতের সময় কল্পনা দত্তের কাছ থেকে প্রীতিলতা সম্পর্কিত খোঁজ খবর জানতে চান।[৫৬] এরমধ্যে একবার মাষ্টারদার সংগঠন চালানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু অর্থের প্রয়োজন দেখা দিল। প্রীতিলতার বাবা সংসারের খরচ চালানোর জন্য মাসিক বেতনের পুরো টাকাটা প্রীতিলতার হাতে দিতেন। তিনি ঐ টাকাটা সংগঠনের কাজে দিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু তা নিতে কল্পনা দত্ত আপত্তি করায় প্রীতিলতা কেঁদে বলেন “গরিব দেখে আমাদের টাকা নিতে চান না। আমি যে নিষ্ঠাবান কর্মী হতে পারব তার প্রমাণ করার সুযোগও কি আমায় দেবেন না?”।[৫৭][৫৮] প্রীতিলতার প্রবল আগ্রহের কারণেই কল্পনা দত্ত একদিন রাতে গ্রামের এক ছোট্ট কুটিরে তাঁর সাথে নির্মল সেনের পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৩২ সালের মে মাসের গোড়ার দিকে ঐ সাক্ষাতে নির্মল সেন প্রীতিলতাকে পরিবারের প্রতি কেমন টান আছে তা জানতে চাইলেন। জবাবে তিনি বলেন “টান আছে। কিন্তু duty to family-কে duty to country-র কাছে বলি দিতে পারব”।[৫৯] যুব বিদ্রোহের পর বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া সংগঠনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে মাষ্টারদা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার কারণে প্রীতিলতার সাথে সে রাতে তাঁর দেখা হয়নি। প্রীতিলতার সাথে এই সাক্ষাতের কথা বলেতে গিয়ে মাষ্টারদা লিখেছেন “অল্প কয়েকদিন পরেই নির্মলবাবুর সঙ্গে আমার দেখা হতেই নির্মলবাবু আমায় বললঃ আমি রাণীকে (প্রীতিলতার ডাক নাম) কথা দিয়েছি আপনার সঙ্গে দেখা করাব, সে এক সপ্তাহের জন্য যে কোন জায়গায় আসতে রাজ়ী আছে। রামকৃষ্ণের সঙ্গে সে ফাঁসীর আগে দেখা করেছে শুনেই তার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হয়েছিল। তার দেখা করার ব্যাকুলতা শুনে রাজী হলাম এবং কয়েকদিনের মধ্যে (মে মাসের শেষের দিকে) তাকে আনার ব্যবস্থা করলাম”।[৫৬] মাষ্টারদা এবং প্রীতিলতার প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনাতে মাষ্টারদা লিখেছেন “তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম। এতদূর পথ হেঁটে এসেছে, তার জন্য তার চেহারায় ক্লান্তির কোন চিহ্নই লক্ষ্য করলাম না। যে আনন্দের আভা তার চোখে মুখে দেখলাম, তার মধ্যে আতিশয্য নেই, Fickleness নেই, Sincerity শ্রদ্ধার ভাব তার মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন উচ্চশিক্ষিত cultured lady একটি পর্ণকুটিরের মধ্যে আমার সামনে এসে আমাকে প্রণাম করে উঠে বিনীতভাবে আমার দিকে দাঁড়িয়ে রইল, মাথায় হাত দিয়ে নীরবে তাকে আশীর্ব্বাদ করলাম..."।[৬০] রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে তার দেখা হও্য়ার ইতিবৃত্ত, রামকৃষ্ণের প্রতি তার শ্রদ্ধা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রীতিলতা প্রায় দুই ঘন্টার মতো মাষ্টারদার সাথে কথা বলেন। মাষ্টারদা আরো লিখেছেন “তার action করার আগ্রহ সে পরিষ্কার ভাবেই জানাল। বসে বসে যে মেয়েদের organise করা, organisation চালান প্রভৃতি কাজের দিকে তার প্রবৃত্তি নেই, ইচ্ছাও নেই বলে”। তিন দিন ধরে ধলঘাট গ্রামে সাবিত্রী দেবীর বাডিতে অবস্থানকালে আগ্নেয়াস্ত্র triggering এবং targeting এর উপর প্রীতিলতা প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন।
বিপ্লবী কর্মকান্ড
ধলঘাটে সংঘর্ষ
ধলঘাট সংঘর্ষের স্থানে নিহত বিপ্লবীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ।
## শহীদ মিনারের খুদাই করা অংশ।
পূর্ণেন্দু দস্তিদারের নির্মিত শহীদ মিনারের গায়ে মার্বেল পাথরের স্মৃতিফলক।
প্রীতিলতার স্মৃতিতে নির্মিত শহীদ মিনার।
## এই ছবিটি চট্টগ্রাম (বাংলাদেশ) এর পটিয়া থানার ধলঘাটে অবস্থিত ১৯৭০ সালে নির্মিত প্রীতিলতা ও অর্ধেন্দু দস্তিদার স্মরনে শহীদ মিনার এর স্থিরচিত্র । অর্ধেন্দু দস্তিদারের বড় ভাই পূর্ণেন্দু দস্তিদার এই শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এটি প্রীতিলতার জন্মস্থানের সন্মূখে নির্মাণ করা হয়। এই ছবিটি ধারন করার সময় শহীদ মিনারটিতে অবহেলা ও অযত্নের ছাপ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
Image may contain: 1 person, plant and outdoor
১৯৩২ সাল--চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দুই বছর অতিক্রম হয়ে গেল। ইতোমধ্যে বিপ্লবীদের অনেকেই নিহত এবং অনেকেই গেপ্তার হয়েছেন। এই বছরগুলোতে আক্রমণের নানা পরিকল্পনার পরেও শেষ পর্যন্ত বিপ্লবীরা নুতন কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারে নাই। এসব পরিকল্পনার মূলে ছিলেন মাষ্টারদা এবং নির্মল সেন। এই দুজন আত্মগোপণকারী বিপ্লবী তখনো গ্রাম থেকে গ্রামে বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে ঘুরে ঘুরে সাংগঠনিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন।এই আশ্রয়স্থলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর টিনের ছাউনি দেয়া মাটির দোতলা বাড়িটা।পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামটা ছিল বিপ্লবীদের অতি শক্তিশালী গোপন আস্তানা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন এবং জালালাবাদ যুদ্ধের পর থেকে এই গ্রামে ছিলো মিলিটারি ক্যাম্প। এই ক্যাম্প থেকে সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপনরত বিপ্লবীদের ধরার চেষ্টা করত।[৬৩] সাবিত্রী দেবীর বাড়ি ছিল ঐ ক্যাম্প থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। বিপ্লবীদের কাছে ঐ বাড়ির গোপন নাম ছিল “আশ্রম”।[৬৪] বিধবা সাবিত্রী দেবী এক ছেলে এবং বিবাহিতা মেয়েকে নিয়ে ঐ বাড়িতে থাকতেন।[৬৩] বিপ্লবীদের কাছে তিনি ছিলেন “সাবিত্রী মাসিমা”।[৬২] এই আশ্রমে বসে সূর্য সেন এবং নির্মল সেন অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে সাক্ষাত করতেন এবং আলোচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক সময় এই বাড়িতেই তাঁরা দেশ বিদেশের বিপ্লবীদের লেখা বই পড়ে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা লিখে সময় কাটাতেন। ১৯৩২ সালের ১২ জুন তুমুল ঝড় বৃষ্টির দিনে মাষ্টারদার পাঠানো এক লোক প্রীতিলতাকে আশ্রমে নিয়ে আসেন।[৬৪] বাড়িতে প্রীতিলতা তাঁর মাকে সীতাকুন্ড যাবার কথা বলেন। মাষ্টারদা এবং নির্মল সেন ছাড়া ঐ বাড়িতে তখন ডিনামাইট ষড়যন্ত্র মামলার পলাতক আসামী তরুন বিপ্লবী অপূর্ব সেন (ভোলা) অবস্থান করছিলেন। ১৩ জুন সন্ধ্যায় সূর্য সেন এবং তাঁর সহযোগীদের সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে অবস্থানের কথা পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প জানতে পারে। এর আগে মে মাসেই ইংরেজ প্রশাসন মাষ্টারদা এবং নির্মল সেনকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে ১০,০০০ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দেন। ক্যাম্পের অফিসার-ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন খবরটা জানার পর ঐ বাড়িতে অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুরস্কার এবং পদোন্নতির আশা নিয়ে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন দুজন সাব-ইন্সপেক্টর, সাতজন সিপাহী, একজন হাবিলদার এবং দুজন কনষ্টেবল নিয়ে রাত প্রায় ৯টার দিকে ধলঘাটের ঐ বাড়িতে উপস্থিত হন।[৬৫] এর একটু আগেই মাষ্টারদা এবং প্রীতিলতা দোতলা বাড়িটার নীচতলার রান্নাঘরে ভাত খেতে বসেছিলেন। জ্বরের কারণে নির্মল সেন এবং ভোলা রাতের খাবার খাওয়া বাদ দিয়ে উপরের তলায় শুয়ে ছিলেন। মাষ্টারদার সাথে খেতে বসে অস্বস্তি বোধ করায় প্রীতিলতা দৌড়ে উপরে চলে যান। প্রীতিলতার লজ্জা দেখে নির্মল সেন খুব হেসেছিলেন।এমন সময় মাষ্টারদা ঘরের ভিতরের মই বেয়ে দোতলায় উঠে বলেন “নির্মলবাবু, পুলিশ এসেছে”। মাষ্টারদা প্রীতিলতাকে নিচে নেমে এসে মেয়েদের সাথে থাকার নির্দেশ দেন। ততক্ষনে সিপাহী এবং কনষ্টেবলরা ঘর ঘিরে ফেলেছে। ক্যাপ্টেন ক্যামেরন এবং সাব-ইন্সপেক্টর মনোরঞ্জন বোস ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ঘরের একতলায় থাকা সাবিত্রী দেবী ও তাঁর ছেলে মেয়েকে দেখতে পান। “ঘরে আর কে আছে?” এ প্রশ্ন করে কোন উত্তর না পাওয়া অভিযান পরিচালনাকারীরা এসময় ঘরের উপরের তলায় পায়ের আওয়াজের শব্দ শুনতে পান।[৬৭] ক্যাপ্টেন ক্যামেরন হাতে রিভলবার নিয়ে ঘরের বাইরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতেই নির্মল সেনের করা দুইটা গুলিতে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন মৃত্যুবরন করেন। গুলির শব্দ পাওয়ার পরেই ঘরের চারিদিকে থাকা সৈন্যরা চারিদিক থেকে প্রচন্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। একটা গুলি এসে নির্মল সেনের বুকে লাগে এবং প্রচুর রক্তক্ষরনে তাঁর মৃত্যু হয়। টাকা পয়সা এবং কাগজপত্র গুছিয়ে প্রীতিলতা এবং অপুর্ব সেনকে সঙ্গে নিয়ে মাষ্টারদা অন্ধকারে ঘরের বাইরে আসেন। এই সময়ে আমের শুকনো পাতায় পা পড়ার শব্দ পেয়ে আশেপাশে থাকা সিপাহীদের চালানো গুলিতে সবার আগে থাকা অপুর্ব সেন মারা যান। মাষ্টারদা আর প্রীতিলতা সেই রাতে কচুরিপানা ভরা পুকুরে সাঁতার কেটে আর কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে পটিয়ার কাশীয়াইশ গ্রামে দলের কর্মী সারোয়াতলী স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র মনিলাল দত্তের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান।[৭২] মণিলাল ঐ বাড়ির গৃহশিক্ষক ছিলেন।[৭১] মাষ্টারদার জন্য রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরন লিখে ধলঘাটে এনেছিলেন প্রীতিলতা। সে পান্ডুলিপি পুকুরের মধ্যে হারিয়ে গেলো।[৭২] তাঁদেরকে নিরাপদ কোন আশ্রয়ে নিয়ে যেতে বলেন মাষ্টারদা। মণিলাল দত্ত তাদেরকে ধলঘাট হতে ছয় কিলোমিটার দূরে পাহাড়, জঙ্গল এবং নদীর কাছাকাছি একটা গ্রাম জৈষ্ট্যপুরায় নিয়ে যেতে মনস্থির করেন। পুলিশ আসলে পাহাড় এবং জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা যাবে অথবা নদী পার হয়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়া যাবে। অনেক প্রতিকূল পথ অতিক্রমের পর তাঁরা জৈষ্ট্যপুরা গ্রামে বিপ্লবীদের আরেকটা গোপন আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছান।[৭২][৭৩] ঐ গুপ্ত আস্তানাটি বিপ্লবীদের কাছে “কুটির” নামে পরিচিত ছিল। ঐ কুটিরে তখন আত্মগোপণে ছিলেন সুশীল দে, কালীকিংকর দে এবং মহেন্দ্র চৌধুরী। সূর্য সেন পরের দিন প্রীতিলতাকে বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দেন। এর আগে সূর্য সেনের নির্দেশে মণিলাল প্রীতিলতার বাসায় পুলিশের নজরদারী আছে কিনা তা জানতে শহরে আসেন। “সব কিছু ঠিক আছে” জানার পর প্রীতিলতাকে বাড়ি গিয়ে স্কুল শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়। "চট্টগ্রামে সৈন্য ও বিপ্লবীদের সংঘর্য" শিরোনামে ধলঘাট সংঘর্ষের খবরটা ১৫ জুন ১৯৩২ সালে দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ঃ


"এইমাত্র সংবাদ আসিয়াছে যে, গতরাত্রে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ার নিকটে বিপ্লবী ও সৈন্যদের এক সংঘর্য হইয়া গিয়াছে। ফলে গুর্খা বাহিনীর ক্যাপ্টেন ক্যামেরন ও দুইজন বিপ্লবী নিহত হইয়াছেন। বিপ্লবীদের নিকট দুইটি রিভলবার ও গুলি ইত্যাদি পাওয়া গিয়াছে। নিহত বিপ্লবীদের একজনকে নির্মল সেন বলিয়া সনাক্ত করা হইয়াছে।"


আত্মগোপন


ধলঘাট সংঘর্ষের সে রাতেই গোলাগুলিতে ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের মৃত্যুর পর পুলিশের এস. আই মনোরঞ্জন বোস পটিয়ার মিলিটারী ক্যাম্পে গিয়ে আরো ত্রিশজন সৈন্য এবং একটা লুইস গান নিয়ে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে ফিরে আসেন। লুইস গানের গুলিবর্ষণে বাড়িটা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও সেনাধ্যক্ষ মেজর গর্ডন দলবল নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে। সাবিত্রী দেবী এবং তাঁর পুত্র কণ্যাকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেবার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কণ্যা স্নেহলতার জবানবন্দিতে আরো তিন যুবক—দীনেশ দাশগুপ্ত, অজিত বিশ্বাস, এবং মনীন্দ্র দাশকে আটক করা হয়। পরবর্তীকালে সাবিত্রী দেবী, তাঁর পুত্র রামকৃষ্ণ, এবং এই তিন যুবককে বিপ্লবীদের আশ্রয় এবং সহায়তা করার দায়ে চার বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। ঘরের ভেতর চালানো তল্লাশীতে রিভলবার, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের দুইটা ছবি, পাশাপাশি দুইটা মেয়ের ছবি (যার মধ্যে একজন ছিল প্রীতিলতা) সহ কিছু চিঠি এবং দুইটা বইয়ের পান্ডুলিপি পাওয়া যায়।[৭৬] ধলঘাটে ছবি পাওয়ার পর ১৯ জুন পুলিশ বাসায় গিয়ে প্রীতিলতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।[৭৯] ২২ জুন এস.আই শৈলেন্দ্র সেনগুপ্ত এর নেতৃত্বে একটি দল ঐ বাড়িতে আরেক দফা তল্লাশি চালায়। তাঁর নির্দেশে আশে পাশের সব জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হয়। জঙ্গল এবং আশেপাশের পুকুরে তল্লাশীতে অনেক কাগজপত্র উদ্ধার করা হয় যা থেকে প্রমাণিত হয় চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের পর আত্মগোপনে থেকে ও বিপ্লবীরা তাঁদের আদর্শের সাথে অভিন্ন বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়া এবং সামরিক প্রশিক্ষন চালিয়ে যাচ্ছিল। তল্লাশি অভিযানে কাজিন পরিচয় দিয়ে অমিতা দাশের (প্রীতিলতার) আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসির প্রতীক্ষারত রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাতের হাতে লেখা একটা বিবরন পাওয়া যায়।[৮০][৮১] ঐ হাতের লেখার সাথে মেলানোর জন্য ৩০ জুন প্রীতিলতার বাসা থেকে পুলিশ তাঁর গানের একটা বই নিয়ে যায়। মাষ্টারদা প্রীতিলতাকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন।[৭৯] ৫ জুলাই মনিলাল দত্ত এবং বীরেশ্বর রায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রীতিলতা আত্মগোপন করে। ছাত্রী পড়ানোর কথা বলে তিনি বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। পিতা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার অনেক খোঁজ খবর করেও কোন সন্ধান পাননি। ব্যর্থ হয়ে যখন থানায় খবরটা জানানো হল, পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর যোগেন গুপ্ত আরেক নারী বিপ্লবী কল্পনা দত্তের বাড়িতে যান। কল্পনা দত্ত ঐ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন “আমাদের বাসায় এসে গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর বলেঃ এত শান্তশিষ্ট নম্র মেয়ে ও, এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে, ভাবতেও পারি না তার ভিতর এত কিছু আছে! আমাদের খুব ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়ে গেল।”[৮২] চট্টগ্রাম শহরের গোপন আস্তানায় কিছু দিন কাটিয়ে প্রীতিলতা পড়ৈকড়া গ্রামের রমণী চক্রবর্তীর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বিপ্লবীদের আরেক গোপন আস্তানা এই বাড়িটার সাংকেতিক নাম ছিল “কুন্তলা”।[৮৩] এই বাড়িতে তখন আত্মগোপনে ছিলেন মাষ্টারদা এবং তারকেশ্বর দস্তিদার। প্রীতিলতার আত্মগোপনের খবর ১৩ জুলাই ১৯৩২ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। “চট্টগ্রামের পলাতকা” শিরোনামের এই সংবাদে লেখা হয় “চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার ধলঘাটের শ্রীমতী প্রীতি ওয়াদ্দাদার গত ৫ই জুলাই, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম শহর হইতে অন্তর্ধান করিয়াছেন। তাঁহার বয়স ১৯ বৎসর। পুলিশ তাঁহার সন্ধানের জন্য ব্যস্ত”।[৮৪] প্রীতিলতাকে ধরার জন্য বেঙ্গল পুলিশের সি আই ডি কর্তৃক প্রকাশিত ছবিসহ নোটিশটি ছিল নিম্নরূপঃ[৮৫]


"Waddadar, whose photographs are published above. Photograph No 1 was taken 2 years ago when Miss Prithi was a student of the Dacca Eden Intermediate College and photograph No. 2 (sitting postures), which is a more recent one, was found at the time of search of one Apurba Sen alias Bhola (since deceased), in connection with Dhalghat shooting affray at Chittagong.


A Special “look-out” should be kept for her and when traced, the I.B., C.I.D., Bengal, Calcutta, should be informed by wire. A close, though unobtrusive, surveillance should at the same time be kept on her movements.


Description—Miss Prithi Waddadar, daughter of Jagabandhu Waddadar (Baidya by caste), of Dhalghat, Patiya and Jamalkhana, Chittagong town: age 20/21 (looks younger than her age); dark; medium build; short; ugly in appearance."

ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব।
ইউরোপিয়ান ক্লাবের সম্মুখের স্মৃতিফলক।

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ। কিন্তু গুড ফ্রাইডের কারণে সেদিনের ঐ পরিকল্পনা সফল করা যায়নি। চট্টগ্রাম শহরের উত্তরদিকে পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে এই ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড় ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে প্রহরীদের অবস্থান ছিল। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা ব্যতীত এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না।[৬৪] ক্লাবের সামনের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “ডগ এন্ড ইন্ডিয়ান প্রহিবিটেড”।[৮৬] সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। আত্মগোপনকারী বিপ্লবীরা ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের জন্য নুতনভাবে পরিকল্পনা শুরু করে। চট্টগ্রাম শহরের কাছে দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে ঐ ক্লাবেরই একজন বেয়ারা যোগেশ মজুমদারের বাড়িতে বিপ্লবীরা আশ্রয় পেলেন।[৮৪] ১৯৩২ এর ১০ আগষ্ট ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দিন ধার্য করা হয়। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাতজনের একটা দল সেদিন ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর প্রতিজ্ঞা ছিল ক্লাব আক্রমণের কাজ শেষ হবার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার যদি সুযোগ থাকে তবুও তিনি আত্মবিসর্জন দেবেন। তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। গভীর রাতে কাট্টলীর সমুদ্রসৈকতে তাঁর মৃতদেহ সমাহিত করা হয়।মাষ্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে ক্লাবে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই আক্রমণের দায়িত্ব তিনি নারী বিপ্লবীদের উপর দেবেন বলেন মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু সাতদিন আগেই পুলিশের হাতে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ধরা পরে গেলে আক্রমণে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার উপর।[৭৯][৮৯] ২৩ সেপ্টেম্বর এ আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকা দেবার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি, পায়ে রবার সোলের জুতা। ইউরোপীয় ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বলেই প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবী ছেলেদের মত পোশাক পড়ানো হয়েছিল। আক্রমণে অংশ নেয়া কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী পোষাক ছিল ধুতি আর শার্ট। লুঙ্গি আর শার্ট পরনে ছিল মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে আর পান্না সেন এর। বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার (বিপ্লবীদের দেয়া তাঁর গোপন নাম ছিল জয়দ্রথ) ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখানোর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় চল্লিশজন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করে। পূর্বদিকের গেট দিয়ে ওয়েবলি রিভলবার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা, শান্তি চক্রবর্তী আর কালীকিংকর দে। ওয়েবলি রিভলবার নিয়ে সুশীল দে আর মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দক্ষিণের দরজা দিয়ে এবং ৯ ঘড়া পিস্তল নিয়ে বীরেশ্বর রায়, রাইফেল আর হাতবোমা নিয়ে পান্না সেন আর প্রফুল্ল দাস ক্লাবের উত্তরের জানালা দিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিলেন। প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ক্লাবঘরের সব বাতি নিভে যাবার কারণে সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করতে লাগল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার ছিল। তাঁরা পাল্টা আক্রমণ করল। একজন মিলিটারী অফিসারের রিভলবারের গুলিতে প্রীতিলতার বাঁ-পাশে গুলির আঘাত লাগে। প্রীতিলতার নির্দেশে আক্রমণ শেষ হলে বিপ্লবী দলটার সাথে তিনি কিছুদূর এগিয়ে আসেন। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী সেদিনের এই আক্রমণে মিসেস সুলিভান নামে একজন নিহত হয় এবং চারজন পুরুষ এবং সাত জন মহিলা আহত হয়।
মৃত্যু এবং অতঃপর ইউরোপিয়ান ক্লাবের পাশের এই স্থানে প্রীতিলতা আত্মাহুতি দেন।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্বসিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে দেন। কালীকিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে, কালীকিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন।
বাংলা ভাষার উইকিসংকলনে এই নিবন্ধ বা অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত মৌলিক রচনা রয়েছে: মায়ের কাছে প্রীতিলতার শেষ পত্র

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে অংশ নেয়া অন্য বিপ্লবীদের দ্রুত স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দেন প্রীতিলতা। পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রীতিলতাকে বিপ্লবী শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই স্থান ত্যাগ করে। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে মৃতদেহ দেখে পরবর্তীতে প্রীতিলতাকে সনাক্ত করেন। তাঁর মৃতদেহ তল্লাশীর পর বিপ্লবী লিফলেট, অপারেশনের পরিকল্পনা, বিভলবারের গুলি, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি এবং একটা হুইসেল পাওয়া যায়। ময়না তদন্তের পর জানা যায় গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না এবং পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ।


বেঙ্গল চিফ সেক্রেটারী প্রীতিলতার মৃত্যুর পর লন্ডনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটা রিপোর্টে লেখেনঃ

"Pritilata had been closely associated with, if not actually the mistress of, the terrorist Biswas who was hanged for the murder of Inspector Tarini Mukherjee, and some reports indicate that she was the wife of Nirmal Sen who was killed while attempting to evade arrest of Dhalghat, where Captain Cameron fell."

প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অবস্থা নিয়ে কল্পনা দত্ত লিখেছেনঃ “প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন, কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে'। তাঁদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না, তবু তিনি সে দুঃখেকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন, আজো তাঁদের সেভাবে চলছে। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তাঁর প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন”।

কল্পনা দত্ত ১৯৩০ সালে প্রীতিলতার বাড়িতে এক আলাপচারিতা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ “কথা হচ্ছিল, পাঁঠা কাটতে পারব কি না। আমি বলেছিলাম, ‘নিশ্চয় পারব, আমার মোটেই ভয় করে না’। প্রীতি উত্তর দিয়েছিল ‘ভয়ের প্রশ্ন না, কিন্তু আমি পারব না নিরীহ একটা জীবকে হত্যা করতে’। একজন তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করল ‘কী, দেশের স্বাধীনতার জন্যও তুমি অহিংস উপায়ে সংগ্রাম করতে চাও?’ আমার মনে পড়ে প্রীতির স্পষ্ট জবাব, ‘স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও পারব, প্রাণ নিতে মোটেই মায়া হবে না। কিন্তু নিরীহ জীব হত্যা করতে সত্যি মায়া হয়, পারব না।’”


প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দের নামেও পরিচিত (জন্ম: মে ৫, ১৯১১; মৃত্যু সেপ্টেম্বর ২৪, ১৯৩২) ডাকনাম রাণী, ছদ্মনাম ফুলতার, একজন বাঙালী ছিলেন, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা শহীদ ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম নেয়া এই বাঙালি বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে তখনকার ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সময় তিনি ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দল পরিচালনা করেন।এই ক্লাবটিতে একটি সাইনবোর্ড লাগানো ছিলো যাতে লেখা ছিলো "কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ"। প্রীতিলতার দলটি ক্লাবটি আক্রমণ করে এবং পরবর্তিতে পুলিশ তাদের আটক করে। পুলিশের হাতে আটক এড়াতে প্রীতিলতা সায়ানাইড গলাধঃকরন করে আত্মহত্যা করেন।
প্রীতিলতার জন্মস্থানের ধ্বংসাবশেষ। ভিটা বাড়ীর কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।

শৈশব

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ই মে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরানী জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার এবং মাতা প্রতিভাদেবী। তাঁদের ছয় সন্তানঃ মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা ও সন্তোষ। তাঁদের পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। পরিবারের কোন এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে “ওয়াহেদেদার” উপাধি পেয়েছিলেন, এই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার। শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার তাঁর পৈতৃক বাড়ি ডেঙ্গাপাড়া সপরিবারে ত্যাগ করেন। তিনি পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে মামার বাড়িতে বড় হয়েছেন। এই বাড়িতেই প্রীতিলতার জন্ম হয়। আদর করে মা প্রতিভাদেবী তাঁকে “রাণী” ডাকতেন। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের আসকার খানের দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন ওয়াদ্দেদার পরিবার। অন্তর্মুখী, লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের প্রীতিলতা ছেলেবেলায় ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা ইত্যাদি কাজে মা-কে সাহায্য করতেন।


শিক্ষাজীবন
প্রীতিলতার ম্যাট্রিকুলেশন পাশের সনদ।


ডা. খাস্তগীর সরকারী বালিকা বিদ্যালয় ছিল প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১৮ সালে তিনি এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন।[১৪] প্রতি ক্লাসে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি সব শিক্ষকের খুব প্রিয় ছিলেন। সেই শিক্ষকের একজন ছিলেন ইতিহাসের ঊষাদি। তিনি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষীবাই এর ইংরেজ সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত (পরবর্তীকালে বিপ্লবী)। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।তাঁদের স্বপ্নের কথা লিখেছেন কল্পনা দত্তঃ "কোন কোন সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানী হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদেরকে আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম।"স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো।১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অঙ্কের নম্বর খারাপ ছিল বলে তিনি বৃত্তি পাননি।ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বন্ধের সময় তিনি নাটক লিখেন এবং মেয়েরা সবাই মিলে সে নাটক চৌকি দিয়ে তৈরী মঞ্চে পরিবেশন করেন। পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার সময়টাতে তাঁর বাড়িতে এক বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু প্রীতিলতার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়ের ব্যবস্থা তখনকার মতো স্থগিত হয়ে যায়।আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ়ের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতন ও হয়ে যেত। এ কারণেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বেথুন কলেজে মেয়েদের সাথে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। বানারসী ঘোষ স্ট্রীটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাশীঁ বাজানো উপভোগ করত কলেজের মেয়েরা।প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভাল ফলাফল লাভ করতেন। এই বিষয়ে তিনি অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সাথে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে অনার্স পরীক্ষা তাঁর আর দেয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করেন।কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তর পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাঁদেরকে ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।